মগজ সুরক্ষায় কমান্ডো মোতায়েন

 



মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখে বিশেষ প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত এক বাহিনী। বলা হয়, শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ কমান্ডো তারা। এবং সম্প্রতি ‘সায়েন্স নিউজ’-এ প্রকাশিতএকটি লেখা থেকে জানা গেছে যে, মগজের ওই কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ কিন্তু দেওয়া হয় পেটে।  

যে কোনও প্রাণীর ক্ষেত্রেই ব্রেন বা মস্তিষ্কই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মস্তিষ্ক যদি ঠিক মতো কাজ না করে বা যদি পুরোপুরি বিকল হয়ে যায়, তাহলে একটি প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মস্তিষ্ক যাতে কোনও ধরনের জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত না হয়, তার জন্য প্রকৃতি বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে।

মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতে তিন স্তরের এক মেমব্রেন, বা পাতলা রাবারের চাদরের মত এক বস্তু, মুড়ে রাখে সেটিকে। ওই মেমব্রেনটির নাম ‘মেনিনজেস’। শরীরের আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল আমাদের শিরদাঁড়া। শরীরে যত স্নায়ু আছে, সেগুলিকে ধরে রাখে সেটি। মস্তিষ্কের সব নির্দেশ, শিরদাঁড়ার মধ্যে দিয়ে, স্নায়ুর সুবিস্তৃত জালের মাধ্যমে, পৌঁছে যায় শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। আবার তাদের পাঠানো সব বার্তা স্নায়ুর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, শিরদাঁড়ার মাধ্যমে পৌঁছে যায় শরীরের হেডকোয়ার্টার্সে বা সদর দপ্তরে তথা মস্তিষ্কে। আর সেই বার্তার ভিত্তিতে মস্তিষ্ক পাঠায় তার পরবর্তী নির্দেশ। এই ভাবে মাথার সঙ্গে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আদান-প্রদান চলতে থাকে প্রতি মুহূর্তে।  তাই শিরদাঁড়াও মোড়া থাকে মেনিনজেস মেমব্রেন দিয়ে।  যাতে কোনও জীবাণু সেখানেও থাবা বসাতে না পারে।

ওই মেনিনজেস মেমব্রেন জুড়ে বসে থাকে শরীরের সুরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। বলা হয়, শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার সবচেয়ে অভিজ্ঞ, সবচেয়ে পোড়খাওয়া, সবচেয়ে সাহসী কমান্ডো কোষদেরই মোতায়েন করা হয় মস্তিষ্ক আর শিরদাঁড়াকে রক্ষার করার কাজে। জেড+ সুরক্ষা ব্যবস্থা, আর কি! এই রকম নিশ্ছিদ্র, লৌহকঠিন সুরক্ষা বলয় তৈরি করার কারণ হল, প্রতি এক মিনিটে ৭৫০ মিলিলিটার রক্ত প্রবাহিত হয় মস্তিষ্কের মধ্যে দিয়ে। তার সঙ্গে নানান আগ্রাসী জীবাণুর ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। একবার যদি তারা মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়, তাহলে অতি কঠিন অসুখ দেখা দিতে পারে। তাই, মেনিনজেস মেমব্রেনজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে শরীরের শ্রেষ্ঠ কমান্ডো কোষেরা।  সন্দেহভাজন জীবাণুর আনাগোনা আঁচ পেলেই, ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা।

মগজ আর শিরদাঁড়াকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোষেদেরই দেওয়া হয়। আর কোথায় তারা প্রশিক্ষণ পায়, তা এক সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র থেকে জানা গেছে। মাথার সুরক্ষা ব্যবস্থার কমান্ডোদের গড়েপিটে তৈরি করা হয় পেটে।

কেমব্রিজ ইউনিভারসিটির ইম্মিউলজিস্ট বা শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞ মেন্না ক্লাটওয়ারদি বলেছেন যে, রক্তের সঙ্গে জীবাণু মিশে যাওয়ার সব চেয়ে বেশি সম্ভবনা থাকে পেটে। কারণ, সেখানেই হাজারও ধরনের জীবাণুর বাসা ও আনাগোনা। তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থার কোষগুলি সেখানেই সবচেয়ে বেশি বিজাতীয় জীবাণুর মুখোমুখি হয় ও তাদের প্রতিহত করার সবচেয়ে ভাল প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে।

গবেষকরা দেখেন, জীবাণু ধ্বংসকারী যে ইম্মিউন সেল বা কোষ মাথা আর শিরদাঁড়ার মেনজেস মেমব্রেনে ওৎ পেতে বসে থাকে, তাদের পেটেও থাকতে দেখা গেছে। সেখানেই তারা চিনে নেয় নানান জীবাণুকে।  বুঝে নেয় কীভাবে পরাস্ত করতে হবে তাদের। তারপর সেখান থেকে বাছাই করে তাদের নিয়োগ করা হয় মগজ আর শিরদাঁড়ার মত ভিভিআইপি-দের সুরক্ষীত রাখার কাজে।

 

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

প্রকৃতি তৈরি করছে প্লাস্টিকের পাথর

গাছেরা কি দেখতে পায়