গুবরে পোকার মহাকাশ দর্শন
গুবরে পোকাদের খুব প্রিয় জিনিস গোবর। তা সে যে গরুর গোবর হতেই
হবে তেমন কোনও কথা নেই। গরু, ছাগল, মোষ, বাইসন কিম্বা হাতি, বাঘ, সিংহ, হরিণ, বাঁদর–
অর্থাৎ, যে কোনও প্রাণীর বিষ্ঠার সন্ধান পেলেই, মহাউৎসাহে তারা কাজে লেগে পড়ে। সেই
বিষ্ঠার বল তৈরি করে, সেটিকে পেছনের পা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে উল্টো দিকে হাঁটা দেয়। বলগুলি
তাদের শরীরের তুলনায় কয়েক গুণ বড় হলেও, তাদের কসরতে কোনও ঘাটতি দেখা যায় না। উল্টো
দিকে মুখ করে, বলটিকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে বিপুল উদ্যমে।
কিন্তু তারা যে এমনটা করে তা তো জানাই ছিল। নতুন কথা যা জানা
গেল তা হল, মালের বোঝা উল্টোদিকে ঠেলতে ঠেলতে গুবরেরা কিন্তু মোটামুটি ‘স্ট্রেট লাইন’
বা সরল রেখা ধরে সোজা চলতে থাকে। ডান দিক, বাঁ দিকে বেঁকে যাওয়া, বা পথ হারিয়ে চক্রাকারে
ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় না তাদের। কি করে তা সম্ভব হয়? কালাহরি বা সাহারা মরুভূমিতে,
অথবা অকূল সমুদ্রে, কোনও দিক নির্দেশক ছাড়া মানুষ সোজা চলতে পারে না। এমনটাই দেখা গেছে।
কিন্তু গুবরেরা পারে কী করে? সোজা পথে চলার জন্য কি তারা কোনও দিকচিহ্ন ব্যবহার করে?
এই রহস্য সমাধান করেছেন সুইডেনের লুন্ড ইউনিভারসিটি ও দক্ষিণআফ্রিকার উইটওয়াটারস্যান্ড ইউনিভারসিটির গবেষকরা। ‘অ্যানুয়াল রিভিউ অফ এটিমোলজি’ জার্নালে
প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের গবেষণা পত্র। তাঁরা দেখেছেন, দিনের বেলা গুবরেরা সূর্যকে লক্ষ্য
করে হাঁটতে থাকে। অর্থাৎ, দিক নির্ণয় করতে তারা ব্যবহার করে সূর্যর অবস্থান। ডাইনে
বাঁয়ে না করে, যেদিকে সূর্য, সে দিকেই তারা সোজা চলতে থাকে। গবেষণাগারেও একই রকম আচরণ
করে তারা। সেখানে বিজ্ঞানীরা আসল সূর্যকে ঢেকে দিয়ে, বিপরীত দিকে সূর্যর আলো প্রতিফলিত
করেন। দেখা যায়, গুবরেরা সেই প্রতিফলিত আলোর দিকেই সোজা এগোতে থাকে।
কিন্তু সোজাই বা তারা হাঁটে কেন? একটু এদিক-ওদিক হলে কীই বা
আসে-যায়? গবেষকরা বলছেন যে, একবার গোবরের বল কব্জা করতে পারলে, তারা আর পাঁচটা প্রতিদ্বন্দ্বী
গুবরের কাছে থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর গুবরেরা জানে যে,
সরল রেখায় এগোলেই তারা সবচেয়ে দ্রুত অনেক দূরে চলে যেতে পারবে।
সূর্যকে লক্ষ্য করে চলে বলেই প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত হোরাপল্লো
হয়তো বলেছিলেন যে, গুবরেরা পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায়। কিন্তু সূর্য যখন মাঝ আকাশে থাকে
- এমন একটা অবস্থান যা পূর্বও নয় পশ্চিমও নয় - তখন কি গুবরেরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে?
না, হাল ছাড়ার পাত্র তার নয়। সূর্য যখন মধ্য গগনে, তখন হাওয়া যে দিকে বয়, সেদিকে সোজা
চলতে থাকে গুবরেরা। যেন, বাতাসকে পালে লাগিয়ে, গোবরের বল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলে তারা।
পৃথিবীতে ৮,০০০ প্রজাতির গুবরে বা বিটলের অস্তিত্বের কথা এখনও
পর্যন্ত জানা গেছে। তাদের মধ্যে, ৬০০ প্রজাতি গোবরের প্রতি আশক্ত। তাই যথার্থ নামও
জুটেছে তাদের। দিনের বেলা তারা না হয় সূর্যকে ব্যবহার করে সরল রেখায় পথ চলার জন্য।
কিন্তু দিন শেষ হয়ে রাত্রি নামলে কি করে তারা? অনেক গুবরে তো রাতেও গোবরের বল ঠেলে
নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকে। তখন তারা কাজে লাগায় চাঁদের আলো। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন
যে মৌমাছি, পিঁপড়ে ও আরও অনেক ধরনের পোকা চলাফেরার ক্ষেত্রে সূর্যর আলো কাজে লাগায়।
কিন্তু সূর্যর আলোর তুলনায় অনেক ক্ষীণ চাঁদের আলোকে কাজে লাগিয়ে গুবরে যতটা অনায়াসে
সোজা হেঁটে যায়, সে রকমটা আর কেউ পারে না।
কিন্তু সব রাতে তো আর আকাশে চাঁদ থাকে না। যেমন, অমাবস্যায়।
সেই সব রাতে আকাশ জুড়ে কেবল জ্বলজ্বল করে গ্রহ-নক্ষত্র। আর অগণিত গ্রহ তারাদের নিয়ে
তৈরি ছায়াপথ। গুবরেরা তাদের ছোট ছোট চোখ দিয়ে এক একটি স্বতন্ত্র তারাকে ভাল দেখতে পায়
না। কিন্তু ছায়াপথ তাদের নজরে ধরা পড়ে। তাই অমাবস্যার রাতে সেই ছায়াপথকেই তারা ব্যবহার
করে গোবরের বল সোজা ঠেলে নিয়ে যাওয়ার কাজে।
কিন্তু তারা যে সত্যিই ছায়াপথ দেখতে পায়, বিজ্ঞানীরা তা জানলেন
কি করে? দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের প্ল্যানেটেরিয়াম বা তারামণ্ডলে গুবরেদের নিয়ে
পরীক্ষা চালান তিন বিজ্ঞানী – সুইডেনের লুন্ড ইউনিভারসিটির এরিক ওয়ারেন্ট ও মারি ড্যাকে
এবং জোহানেসবার্গে উইটওয়াটারস্যান্ড ইউনিভারসিটির মারকাস বায়ের্ন। তারামণ্ডলে কৃত্রিম
রাতের আকাশে দৃশ্যমান ছিল ছায়াপথ। দেখা যায়, সেই ছায়াপথকে কাজে লাগিয়ে সোজা এগিয়ে যাচ্ছে
দক্ষিণ আফ্রিকার এক প্রজাতির গুবরে।
আর বিজ্ঞানীরা এও দেখেন, যে রাতে চাঁদ থাকে না, আর কুয়াশা বা
মেঘে ঢাকা পড়ে যায় ছায়াপথ, সেই সব রাতে গুবরেদের চলাফেরা বেশ এলোমেলো হয়ে যায়। আকাশ
দেখতে না পেলে, পৃথিবীর বুকে তাদের চলার পথটা হারিয়ে ফেলে তারা।

বেশ ভালো
ReplyDeleteধন্যবাদ।
Delete