ইলেকট্রিক মাশরুমের দেখা মিলল মেঘালয়ে
ব্যাঙের
ছাতা বা মাশরুম তো অনেক ধরনের হয়। কোনওটা খাওয়া যায়, তো কেনওটা আবার বিষাক্ত। কোনওটা
ঠিক ছাতার মত দেখতে, তো কোনওটা গোল-গোল বোতামের মত। কিন্তু ‘ইলেকট্রিক মাশরুমের’
কথা কি কেউ শুনেছেন? হ্যাঁ, সে রকম মাশরুমও আছে। সেগুলিতে আলো জ্বলে। উত্তর-পূর্ব
ভারতের মেঘালয়ের জঙ্গলে দেখা গেছে ওই বিচিত্র মাশরুম।
মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়া-তেপ্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, ভারতীয় ও চিনা বিজ্ঞানীদের একটি দল ছত্রাক
সম্বন্ধে গবেষণা করতে মেঘালয়ের বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সেখানকার জঙ্গলে এত বিচিত্র
ধরনের সব ছত্রাক দেখতে পান তাঁরা যে, আশ্চর্য হয়ে যান সেই বৈচিত্র দেখে। কিন্তু তাঁরা
জানতেন না যে আরও একটা বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছে তাঁদের জন্য।
এক
দিন গ্রামবাসীরা তাঁদের জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা ‘ইলেকট্রিক মাশরুম’ দেখেছেন কি না। প্রশ্নটা
তাঁদের অবাক করে। না, সে রকম মাশরুম তো তাঁরা দেখেননি। তাই ইলেকট্রিক মাশরুমের সন্ধানে
তাঁরা রওয়ানা দিলেন জয়ন্তিয়া পাহাড়ের উদ্দেশে। সঙ্গে নিলেন একজন স্হানীয় গাইডকে। খাড়াই
জয়ন্তীয়া পাহাড়ের বনপথ যাঁর নখদর্পনে। গন্তব্যে যখন তাঁরা পৌঁছলেন, তখন রাত হয়ে গেছে।
ঝিরঝিরে বৃষ্টিও নেমেছে। তারই মধ্যে, টর্চের আলো জ্বেলে জ্বেলে, গাইডকে অনুসরণ করে,
তাঁরা এক সময় পৌঁছলেন এক ঘন বাঁশ বনে।
পাহাড়ের
এক দুর্গম প্রান্তে এসে, গাইড হাত দেখিয়ে থামতে বললেন সকলকে। তাঁরা পৌঁছে গেছেন ইলেকট্রিক
মাশরুমের জায়গায়। এবার, টর্চ নিভিয়ে দিতে বললেন গাইড। টর্চের আলো নিভতেই, ঘোর অন্ধকারে,
বিজ্ঞানীদের চোখের সামনে, ফুটে উঠল অসংখ্য হাল্কা সবুজ আলো। মনে হল, তাঁরা যেন চলতে
চলতে, অরণ্যে ঢাকা এক স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করেছেন।
শুকিয়ে
যাওয়া বাঁশের গায়ে ওই ছত্রাক জন্মায়। সেগুলি থেকে একটা ক্ষীণ সবুজ আলো বেরতে থাকে।
দেখলে মনে হয়, খুব কম শক্তিসম্পন্ন এলইডি আলো লাগানো আছে গাছের ডালে ডালে। ওই ছত্রাককে
বলা হয় ‘বায়োলুমিনেসেন্ট’ ছত্রাক। বা এমন ছত্রাক যার মধ্যে ‘জৈবিক আলো’ জ্বলে। জানা
গেছে, মেঘালয়ের ওই অঞ্চলে মানুষজন, রাতে ওই ছত্রাক-ভরা বাঁশের টুকর হাতে নিয়ে পথ চলেন।
ভাল
করে লক্ষ করে গবেষকরা দেখেন মাশরুমটির বৃন্ত থেকেই আলো বেরয়। তাঁদের মনে হয়, এটি এক
নতুন প্রজাতির মাশরুম। পরে গবেষণাগারে আরও ভাল করে পরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হন যে,
তাঁদের অনুমান ঠিক। মাশরুমটি নতুন ধরনেরই (‘রোরিডোমাইসেস’ জিনাস থেকে তার উৎপত্তি)।
ভারতে আর কোথাও এই মাশরুম আগে দেখা যায়নি।
ওই
‘ইলেকট্রিক মাশরুমের’ ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেটির প্রধান
লেখক সামান্থা করুণারত্ন হলেন চিনের অ্যাকাডেমি অফ সায়েনসেস-এর একজন ছত্রাক বিশেষজ্ঞ।
যুক্ত আছেন সে দেশের ‘সিএএস কি ল্যাবরেটারি ফর প্লান্টস’-এর সঙ্গে। মোঙ্গাবে কে উনি
বলেছেন যে, ওই মাশরুম ভিজে ও আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে। এবং তারা এক বিশেষ প্রজাতির
পোকার ওপর নির্ভরশীল। ওই পোকাই ইলেকট্রিক মাশরুমের বীজ ছড়িয়ে দেয়। তাই যেখানে ওই
পোকা নেই, সেখানে ইলেকট্রিক মাশরুমও নেই।
তিনি
এও বলেছেন যে, আরও লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ওই মাশরুম কেবল এক ধরনের বাঁশের গায়েই জন্মায়
(ফিল্লোস্টাকিস মান্নি)। সেই বাঁশ শুকিয়ে গেলে, তার গায় ওই মাশরুম ফুটে বেরয়। তার
মানে, যেখানে ওই বিশেষ বাঁশঝাড় নেই, সেখানে ইলেকট্রিক মাশরুমেরও দেখা মেলে না। জীবনধারণের
জন্য কেন তারা ওই বাঁশকেই বেছে নিয়েছে, তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন
বিজ্ঞানী করুণারত্ন। মেঘালয়ের পশ্চিম জয়ন্তীয়া হিল ও পূর্ব খাসি হিল জেলায় ওই বিশেষ
ধরনের পোকা, বাঁশ আর মাশরুম পাওয়া যায়।
পৃথিবীতে
প্রায় ১,২০,০০০ প্রজাতির ছত্রাকের কথা জানা গেছে এ পর্যন্ত। তাদের মধ্যে অন্ধকারে জ্বলজ্বল
করা ১০০ প্রজাতি ইয়োরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়ায়
পাওয়া যায়।
ভারতেও
দু’টি পাওয়া গেছে পূর্ব ও পশ্চিমঘাট পর্বতমালায়। একটি কেরলে। এবার আরও একটি নতুন প্রজাতি
দেখা গেল মেঘালয়ের পাহাড়ে। মোঙ্গাবে-কে উনি বলেছেন, ছত্রাকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ওষোধি
গুণ থাকে। কিন্তু ভারতের মতো এক বিরাট দেশে মাত্র ১,৯০০ প্রজাতির মাশরুম তৈরি করে
এমন ছত্রাককে শনাক্ত করা গেছে এ পর্যন্ত।
তাঁর
মতে, ভারতের বৈচিত্র ও আয়তনের তুলনায় ওই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। গবেষণা চালালে আরও অনেক
নতুন নতুন প্রজাতির ছত্রাকের সন্ধান পাওয়া যাবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
ছবি: মোঙ্গাবেইন্ডিয়া.কম

Comments
Post a Comment