ধনধান্যে ভরা ছিল সিন্ধু সভ্যতা


কথায় বলে ‘ভেতো বাঙালি
। অন্তত এক বেলা ভাত না খেলে মনেই হয় না দিনের আহার সম্পূর্ণ হল। আসলে ভাত বাঙালির বড় প্রিয় খাবার। সারা ভারতে, বা ভারতীয় উপমহাদেশেই, ভাত - অর্থাৎ চাল - প্রধান খাদ্যগুলির মধ্যে একটি। চাল এ দেশে নানা ভাবে খাওয়া হয় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত।

এত কাল মনে করা হত এ হেন প্রিয় চাল প্রাচীন কালে ভারতে উৎপন্ন হত না। ধারণা ছিল যে বন্য ধানকে চাষযোগ্য করে তুলে তাকে খাওয়ার উপযোগী করে তোলা হয় চিন দেশে।  সে দেশ থেকে নানা পথ ঘুরে চাল আসে ভারতে আজ থেকে ৪০০০ বছর আগে। তারপর ধীরে ধীরে ধান চাষ করতে শেখে এখানকার মানুষ। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে অতীতের কাহিনীটি  ঠিক এ রকম নয়। বরং চিনে যে সময় ধান চাষ হচ্ছিল ভারতের সিন্ধু সভ্যতার মানুষজনও ঠিক সেই সময়ই ধান চাষে ব্যস্ত থাকতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তেমনটাই জানা গেছে।
যৌথ ভাবে গবেষণা করেছেন ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজও অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটি ও ভারতের বেনারস হিন্দু ইউনিভারসিটির বিশেষজ্ঞরা

আজকের উত্তরপ্রদেশের সন্ত কবির জেলায় লাহুরাদেওয়া নামের এক জায়গা আছে। এক সময় সেটি ছিল সিন্ধু সভ্যতার অঙ্গ। সেখানে খনন কাজ চালিয়ে যে প্রাচীন নিদর্শন মিলেছে তা থেকে জানা যাচ্ছে যে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালে চিন থেকে ধান চাষের পদ্ধতি এখানে এসে পৌঁছনর প্রায় আরও ৪৩০ বছর আগে - অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৪,৫০০ বছর পূর্বে - ওই লাহুরাদেওয়ায় ধান চাষ হত।

আরও জানা গেছে যে সিন্ধু সভ্যতায় একাধিক শস্য উৎপাদন করত সে কালের চাষিরা। গ্রীষ্মে চাষ হত ধান, বাজরা, বিন; আর শীতের সময় বোনা হত গম, যব আর ডাল। এবং এ সবের জন্য ছিল বিশেষ জল সেচের ব্যবস্থাও।

মিশ্র কৃষি কাজের যে প্রমাণ সেখানে পাওয়া গেছে তা পৃথিবীর প্রাচীনতমগুলির মধ্যে পড়ে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। “আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে সেখানে ‘ওরিজা নিভারাপ্রজাতির বন্য ধানকে নিজস্ব উপায়ে কৃষিজাত করা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালে, চিনের পদ্ধতি এসে পৌঁছনর আগেই। ভেজা মাটিতে চাষ যেমন হত, তেমনই আবার হত শুষ্ক মাটিতেও,” বলেছেন গবেষক জেনিফার বেটস।

সিন্ধু সভ্যতার চাষবাস ছিল সে কালের অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার কৃষিকাজের থেকে অনেকটাই আলাদা। মানব সভ্যতার আর এক পীঠস্থান মেসোপোটেমিয়ায় (আজকের ইরাক অঞ্চল) চাষ হত শীতের মরশুমে। ফলানো হত মূলত: গম আর যব। তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত সেখানকার মানুষ।

অপর দিকে চিনে, যা ছিল সভ্যতার আরও একটি উজ্জ্বল ক্ষেত্র, সেখানেও চাষ হত একবার ¬- বর্ষার দিনগুলিতে। ফলানো হত প্রধানত ধান আর বাজরা, যা ঘরে ঘরে মজুত করা হত সারা বছরের চাহিদা মেটাতে।

কিন্তু গবেষক বেটস বলছেন যে, সে সময় সিন্ধু সভ্যতায় চাষ হত সারা বছর ধরে। কি গ্রীষ্ম কি শীত, আজকের পাকিস্তান আর ভারতের এক বিরাট এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সিন্ধু সভ্যতায় চাষের ক্ষেত ফাঁকা পড়ে থাকত না। পৃথিবীর অন্যান্য নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা জনপদে মানুষ সারা বছর চাষ করতে শেখে অনেক পরে। 

যে মুগ, অড়হর আর ছোলার ডাল আজ আমরা খেয়ে থাকি, তাও উৎপন্ন হত সেই সিন্ধু সভ্যতার যুগে। দিল্লি থেকে ১৫০ কিমি দূরে হরিয়ানার এক নিরিবিলি গ্রাম রাখিগঢ়ি। সেখানে পাওয়া গেছে ওই সব ডালের প্রাচীন নমুনা। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলি প্রায় ৪,৮৯০ বছরের পুরনো। এমনকি মশলার নমুনাও পাওয়া গেছে খনন কাজের ফলে। বলা হচ্ছে, রাখিগঢ়িতে এক জনপদ গড়ে উঠেছিল, যার আনুমানিক জনসংখ্যা ছিল ৪০,০০০। গ্রামে ফলানো ফসল চাষিরা ওই শহরের বাজারে বিক্রি করতেন বলে জানাচ্ছেন গবেষকরা। অনেকে বলেন, ডাল-ভাত জুটলেই দিন চলে যাবে। নেহাত ভুল বলেন না তাঁরা। সেই সিন্ধু সভ্যতার যুগ থেকে ডাল-ভাতেই যে অভ্যস্ত হয়েছেন এই উপমহাদেশের মানুষ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস