বদলাচ্ছে কেরলের পরিবেশ, বাড়ছে ময়ূর
দক্ষিণ
ভারতের কেরল রাজ্যে ময়ূর মানুষকে বেশ বিপাকে ফেলেছে। সাধারণত শোনা যায় হাতি, বুনো
শুয়োর, হরিণ বা বাঁদরের দল খেতের শস্য খেয়ে চাষির ক্ষতি করে। কিন্তু জানা যাচ্ছে যে, কেরল ও তামিল নাড়ুর কিছু
অংশে, হাতি আর বনের দাঁতাল শুয়োর ছাড়াও এবার শস্য খেতে হানা দিচ্ছে ময়ূর।
একাধিক
প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, ফসল পাকলেই ময়ূরের ঝাঁক এসে হাজির হচ্ছে আর মনের আনন্দে
শস্যদানা খেয়ে, মাঠ ফাঁকা করে চলে যাচ্ছে তারা। আর ফসল খুইয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকছেন
চাষি। কেউ কেউ বলছেন চাষবাস করাই ছেড়ে দেবেন। কারণ ময়ূরদের রুখতে কী ব্যবস্থা নেবেন
তা বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা।
কিছু কাল হল কেরলে ময়ূরের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এক সময় সেখানে ময়ূর প্রায় দেখাই যেত না। কখনও কখনও দু’একটা চোখে পড়ত, এই যা। চাষিরা তেমনটাই বলেছেন সংবাদ মাধ্যমকে। একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, পাখি বিশারদ সেলিম আলি ময়ূরকে কেরলের পাখির তালিকাতেই রাখেননি। মোঙ্গাবে-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৩৩ সালে সেলিম আলি কোচিন আর ট্রিভাঙ্কোরে ১৯টি জায়গায় সমীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু কোথাও মযূর দেখতে পাননি তিনি। সেলিম আলি যেখানে যেখানে সমীক্ষা করেছিলেন, ঠিক সেই সব জায়গায় আবারও সমীক্ষা করা হয় ৭৫ বছর পর। এবার কিন্তু ১৯টি জায়গার মধ্যে ১০টিতে ময়ূরের দেখা মেলে।
এ কথা জানাই যে, মযূর রুক্ষ এলাকার পাখি। যেমন, রাজস্থানে ঘুরতে ফিরতে তাদের দেখা মেলে। নয় রাস্তায় ঝাঁক বেঁধে চরে বেড়ায়, নয় গ্রামের আশেপাশে নিশ্চিন্তে ঘোরে তারা। এ দৃশ্য পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের অনেক জায়গাতেও চোখে পড়ে।
সেই
তুলনায় কেরলের পরিবেশ ভিজে-ভিজে। বৃষ্টি হয় খুব।
সে জায়গাকে ময়ূরদের পক্ষে অনুকূল বলে মনে করা হত না কোনওদিনই। কিন্তু বিগত
কয়েক বছর ধরে তাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এমনই দাঁড়িয়েছে যে, তারা এখন চাষিদের চিন্তার
কারণ হয়ে উঠেছে।
পরিবেশবিদরা
কেরল ও তামিল নাড়ুর কিছু জায়গায় ময়ূরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা কারণ দেখতে পাচ্ছেন।
তাঁদের মতে, ওই সব জায়গা ময়ূর তার বেঁচে থাকার ও বংশবৃদ্ধি করার মতো অনুকূল পরিবেশ
পাচ্ছে বলেই তারা সেখানে আস্তানা গেড়েছে।
বলা
হয়, পাখিদের আচরণ অনেক কিছু বলে দেয়। অর্থাৎ,
ময়ূরের বাড়বাড়ন্ত ইঙ্গিত করছে
যে, কেরলের পরিবেশে একটা বদল ঘটছে। ইতিমধ্যেই তার সঙ্কেত
পাওয়া গেছে। ‘ইকোলজিকাল ইনডিকেটরস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে যে,
কেরলে ময়ূরের সংখ্যাবৃদ্ধি সেখানে পরিবেশগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। গবেষকরা বলেছেন, কেরলের পরিবেশে শুষ্কতার মাত্রা
বাড়ছে। তাই ময়ূরের সংখ্যাও বাড়ছে সেখানে। দেখা গেছে, বর্তমানে কেরলের ১৯ শতাংশ এলাকা
এতটাই শুষ্ক হয়ে উঠেছে যে সেখানে ময়ূররা অনায়াসে বাস করতে পারছে। বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের যে ধারা লক্ষ করা
যাচ্ছে, তা বজায় থাকলে, ২০৫০ নাগাদ ওই শুষ্ক এলাকার আয়তন বেড়ে ৪১ থেকে ৫৫ শতাংশ হয়ে
যেতে পারে। আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে ময়ূরের সংখ্যাও।
কেরলের
থ্রিসুরে কেরালা এগ্রিকালচারাল ইউনিভারসিটির কলেজ অফ ফরেস্ট্রির বন্যপ্রাণী বিভাগের
প্রফেসর ও পি নামীর ও দেরাদুনের ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাঞ্জো যোসে যৌথভাবে
গবেষণাটি করেছেন।
কেরলে যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাচ্ছে, তা আগেই জানা গিয়েছিল। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, সে রাজ্যের বেশ কিছু অঞ্চলে বাৎসরিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বছর ধরেই একটু একটু করে কমছে। তারপর, ২০১৬ সালে প্রকাশিত আরও একটি গবেষণায়ও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
আবহাওয়া যে বদলে যাচ্ছে, কেরলে ময়ূরের সংখ্যাবৃদ্ধি তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে। মোঙ্গাবে-র প্রতিবেদককে নামীর বলেছেন, কেরলে ময়ূরের উপস্থিতি আমাদের একটা বিপদ সংকেত দিচ্ছে।
সেই
বিপদ এড়ানর চাবিকাঠিটা কিন্তু আমাদের হাতেই রয়েছে। সেটি আমরা ব্যবহার করব কিনা তা নির্ভর
করছে আমাদেরই ওপর।

Comments
Post a Comment