জিন কাটার কাঁচি আবিষ্কার
এ
বছর রসায়নে নোবেল পেলেন দুই মহিলা বিজ্ঞানী
ইমানুয়েল শারপেন্তিয়ের (বাঁ দিকে) ও জেনিফার দৌদনা (ডান দিকে)। এই প্রথম, কোনও
একটি বিষয়ে কেবল মহিলা বিজ্ঞানীরাই সম্মানিত হলেন। প্রথম জন হলেন ফরাসি। গবেষণা করেন
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক গবেষণা কেন্দ্রে। দ্বিতীয়জন, মার্কিন বিজ্ঞানী, কাজ করেন
ইউনিভারসিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-বার্কলেতে।
২০১২সালে জিন কাটার কাঁচি আবিষ্কার করেছিলেন তাঁরা।
গবেষণা করেছিলেন একসঙ্গে। তাই নোবেল পেলেন দু’জনই।
হ্যাঁ,
কাঁচি অনেক রকমের হয় - চুল কাটার কাঁচি, গোঁফ কাটার কাঁচি, গাছ কাটার কাঁচি। কিন্তু
জিন কাটার অভিনব কাঁচি নিয়ে এলেন তাঁরাই। এ এমনই এক কাঁচি যা দিয়ে জীবাণু থেকে মানুষ,
কাটছাঁট করে সবই বদলে ফেলা যায়।
পৃথিবীর
সব প্রাণী, তা সে অণুজীব, বটবৃক্ষ বা মহামানব, যেই হোক না কেন, তাদের শারীরিক গঠন
নির্ধারণ করে তাদের জিন। প্রতিটি কোষের মধ্যে থাকে কয়েক’শ থেকে কয়েক হাজার জিন। আর
প্রতিটি জিনের মধ্যে থাকে এক জোড়া লম্বা, একে অপরকে জড়িয়ে থাকা ফিতে। ডিএনএ নামেই
সেগুলি পরিচিত এখন। ওই ডিএনএ-র মধ্যে সূক্ষ্ম রাসায়নিক কোডে লেখা থাকে প্রতিটি প্রাণীর
দেহের গঠনতন্ত্র। বা বলা যেতে পারে, শরীরের
ইমারত গঠনের নীল নক্সা থাকে ডিএনএর মধ্যে, আর সেটিকে ভিত্তি করেই জিন তার শরীর নির্মাণের
কাজ করে যায়।
তাই
কারও চোখ হয় কালো, কারও নীল। কেউ ফর্সা, কেউ শ্যামবর্ণ। কেউ ছ’ ফিট, তো কেউ সাড়ে
তিন ফিট। কারও চুল কোঁকড়া, কারও লম্বা।
শারপেন্তিয়ের
ও দৌদনা আবিষ্কার করলেন এমন এক মলিকিউল যেটি খুব সহজে একটি জিনের ডিএনএ-র নক্সায় পরিবর্তন
ঘটাতে পারে। মলিকিউলটির নাম দেওয়া হল ক্রিসপার ক্যাস-৯। ডিএনএ-র লম্বা ফিতের একটু অংশ কেটে বাদ দিতে পারে
সেটি। বলা যায়, নক্সায় যদি কোনও গলদ থেকে থাকে তা ঠিক করে নেওয়া যায় ওই ভাবে। আর প্রয়োজন হলে, তার জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যায় অন্য
নক্সা। ধরা যাক, কারও শরীরে ক্যানসারের টিউমার দেখা দিয়েছে। তার মানে অবশ্যই ডিএনএর
মধ্যে যে নক্সা রয়েছে সেখানে কোথাও ভুল হয়ে গেছে। তাই ক্যানসারের টিউমারের মত অবৈধ
নির্মাণ করে ফেলেছে জিন। এখন জিন কাটার কাঁচি দিয়ে সহজেই ডিএনএর নক্সায় সেই ত্রুটিপূর্ণ
অংশটি কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে, শরীরে টিউমারের মত বেআইনি নির্মাণের সম্ভাবনাও
থাকে না আর।
তাছাড়া এর বিপুল প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে কৃষির ওপর। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, গাছের ডিএনএ-র কোডে রদবদল ঘটিয়ে লাল গোলাপের গাছে কালো গোলাপ ফোটানো সম্ভব হয়েছে। এখন এমন গাছ তৈরি করা যায় যেটিতে পোকা ধরবে না। চাল আর গমের গুণাগুণ অনেকটা বাড়িয়ে নেওয়া যায় এখন। একটা গাছের ফলনও কয়েক গুণ বাড়ানও সম্ভব।
পশু-পাখির
জগতেও একটা প্রজাতির ডিএনএর কিছু কোড অন্য একটিতে প্রতিস্থাপন করে ‘হাঁসজারু’ সৃষ্টি
করা থিওরির দিক থেকে এখন আর অসম্ভব নয়। আবার এমনও তো হতে পারে যে, এক কালের বিলুপ্ত
অতিকায় লোমশ হাতি ম্যামথের ডিএনএ যদি আজকের
আফ্রিকান বা এশীয় হাতির জিনে জুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো আবার তাদের দেখা যাবে বনে
জঙ্গলে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় পারমাফ্রস্ট বা বরফ-ঢাকা মাটির
তলায় পাওয়া গেছে ম্যামথের প্রায় অবিকৃত দেহাবশেষ।
তাতে সেই আদিমকালের প্রাণীর জিনও অক্ষত আছে। কে বলতে পারে, হয়তো কোনও একদিন গবেষণাগারে ম্যামথের
পুনর্জন্ম হবে।
কিন্তু
ক্রিসপার আবিষ্কার যতই যুগান্তকারী হোক না কেন, বিজ্ঞানীদের একাংশ এর ব্যবহার সম্পর্কে
সন্দিহান। তাঁরা মনে করেন, মানুষ যদি ডিএনএ-র কোডে পরিবর্তন ঘটিয়ে, একের পর এক উদ্ভিদ
ও পশু-পাখির শরীর ও চরিত্র বদলাতে থাকে, তাহলে প্রকৃতির ভারসাম্যে সম্পূর্ণ এলোমেলো
হয়ে যেতে পারে। যার প্রভাব প্রাণীজগতের ওপর হতে পারে অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তাছাড়া
এই জৈবিক প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষকেও তো বদলে ফেলা হতে পারে। ডিএনএ-তে যা লেখা আছে
তা পাল্টে দিয়ে এমন মানুষও তো তৈরি করা অসম্ভব নয় যাদের কোনও ভয়ডর থাকবে না। অসুখ
করবে না। অনুভূতির বালাই থাকবে না। ভাল-মন্দের বোধ বিলুপ্ত হবে। হাজার হাজার রোবটের
মত কেবল আজ্ঞাবহন করতেই হেঁটে চলে বেড়াবে।
এমনটা
যে করা সম্ভব, একজন চিনা বিজ্ঞানী, হে জিয়ানকুই, তা ইতিমধ্যেই করে দেখিয়েছেন। ২০১৮
সালে তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি ক্রিসপার ক্যাস-৯ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, ভ্রূণের মধ্যে
ডিএনএ-র পরিবর্তন ঘটিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন এমন দুই যমজ মেয়ে নবজাতক, যারা কোনওদিনই
এইচআইভির মত রোগে আক্রান্ত হবে না।
তাঁর
এই ঘোষণা বিজ্ঞানী মহলকে স্তম্ভিত করে। কারণ, তিনি দেখিয়ে দেন ক্রিসপার ক্যাস-৯-এর
সাহায্যে মানুষের ডিএনএ-এর কোড বদলে আলাদা ধরনের, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ সৃষ্টি
করা যায়। তাঁর ওই কাজকে বিজ্ঞানের আদর্শ লঙঘন করেছে বলে তাঁর নিন্দা করা হয় এবং চিনের
একটি আদালত তাঁকে তিন বছরের জন্য জেলে পাঠিয়ে দেয়।


Comments
Post a Comment