সুন্দরবনের জীবাণুরা অ্যান্টিবায়োটিককে ভয় পায় না এখন
সুন্দরবনের জীবাণুরা কি অমরত্ব লাভ করেছে? গবেষণা থেকে জানা
গেছে যে, অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবাণু মারার ওষুধ তারা এখন তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে।
ওই ধরনের ওষুধ আর তাদের ওপর কাজ করছে না। নিজেদের শরীরে তারা গড়ে তুলেছে অ্যান্টিবায়োটিকের
বিরুদ্ধে জোরাল প্রতিরোধ। আরও জানা গেছে যে ভারী ধাতু থেকে বাঁচতে তারা গায়ে জড়িয়ে
নিয়েছে এক বিশেষ চাদর।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব-রসায়নের প্রফেসর মৈত্রী ভট্টাচার্য
সুন্দরবনের জীবাণু নিয়ে গবেষণা করছেন। সম্প্রতি সায়েন্স কমিউনিকেটার্স ফোরাম আয়োজিত
এক ফেসবুক আলোচনায় প্রফেসর ভট্টাচার্য শোনান সুন্দরবনের জীবাণুদের কথা।
রয়াল বেঙ্গল টাইগার সহ ছোট বড় নানা প্রাণী আছে সুন্দরবনে। আছে
সেখানকার বিস্ময়কর সুন্দরী গাছ, যাদের শেকড় মাটির গভীরে না গিয়ে এঁটেল মাটির ওপরে মুখ
বার করে অক্সিজেন নেয় বাতাস থেকে। এদের সম্পর্কে কিছুটা জানা থাকলেও, সুন্দরবনের জীবাণুদের
সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা ছিল না এতদিন। অথচ তারাই প্রাণী জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে নানা
ভাবে।
প্রফেসর ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্বের জৈববৈচিত্র সংক্রান্ত এক
বিপুল বৈজ্ঞানিক তথ্য ভাণ্ডার বা জিন ব্যাঙ্ক গড়ে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে
অ্যামাজনের প্রাণীদের জিনের তথ্য যেমন রাখা আছে, তেমনই আছে সাহারা মরুভূমির প্রাণীদের
তথ্যও। তাদের মধ্যে ছোট বড় পশু-পাখিরা আছে। আছে পোকামাকড়। এমনকি জীবাণুদের তথ্যও সংরক্ষিত
আছে। কিন্তু সুন্দরবনের মত বিশ্বের এক অনন্য ও জৈববৈচিত্রে পরিপূর্ণ জঙ্গল সেখানে অনুপস্থিত।
তাই সুন্দরবনের জল আর মাটি সংগ্রহ করে, শুরু হল গবেষণা। উদ্দেশ্য
সেখানকার জীবাণুদের সম্পর্কে জানা। আর সেই গবেষণা থেকে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য যা দেখিয়ে
দিচ্ছে মানুষের কার্যকলাপ কি ভাবে প্রভাবিত করছে সুন্দরবনের জীবাণুদের।
সুন্দরবনের ১১ টি এলাকা থেকে মাটি আর জলের নমুনা সংগ্রহ করা
হয়। তার মধ্যে কিছু জায়গায় মানুষের আনাগোনা যথেষ্ট বেশি। দেখা যায়, সেই সব জায়গায় নদীর
জল বেশ দূষিত। কারণ সেখানে ফেলা হয় নানা আবর্জনা। লঞ্চ আর মোটর-চালিত নৌকো চলাচল করার
ফলে জলে ডিজেলও মেশে রোজ। সেখানকার মাটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাতে লেড, ক্রোমিয়াম
আর ক্যাডমিয়াম’র মতো ভারী ধাতু বিপজ্জনক মাত্রায় রয়েছে।
সুন্দরবনে তো কলকারখানা তেমন নেই। তা হলে এই ভারী ধাতু আসছে
কোথা থেকে, যা বিষিয়ে তুলছে সুন্দরবনের কিছু এলাকার মাটি? গবেষকরা দেখেন তা আসছে কলকাতার
কাছে বানতলা থেকে। সেখানে আছে বড় বড় চামড়ার কারখানা। ছোট ছোট ব্যাটারি শিল্প। ঘরে ঘরে
তৈরি হয় নানা জিনিস। সেই সব কারখানার সমস্ত বর্জ্য খাল দিয়ে বিদ্যাধরী নদীতে গিয়ে পড়ে।
আর নদীর জলে মিশে, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে অন্যান্য নদী আর খাঁড়ি হয়ে তা যেতে থাকে সমুদ্রের
দিকে। সেই চলার পথেই, ওই ভারী ধাতুগুলি জমা হতে থাকে মাটিতে।
এর ফলে যা হচ্ছে তা বেশ চিন্তিত করার মত বিষয়। কারণ দেখা যাচ্ছে,
যে সব জায়গার মাটিতে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেশি, সেখানকার জীবাণুরা নিজেদের শরীরে সেগুলির
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কেমন সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা? দেখা গেছে, ওই জীবাণুরা
তাদের শরীরে চারপাশে একটা ‘বায়ো ফিল্ম’তৈরি করে বা এক বিশেষ পদার্থের
চাদর জড়িয়ে নেয়। সেটা যেন বর্মের মত কাজ করে। ফলে, তাদের মারা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সেখানে ভারী ধাতু প্রতিরোধকারী ব্যাক্টিরিয়া বা জীবাণু যেমন
পাওয়া গেছে, তেমনই পাওয়া গেছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকারী জীবাণুও। কিন্তু সুন্দরবনের
জল-জঙ্গলে ওই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকজয়ী ব্যাক্টিরিয়া তৈরি হল কি করে? এই ধরনের
জীবাণু তো সৃষ্টি হয়, যদি অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ লাগাতার ব্যবহার হতে থাকে।
কোনও ওষুধই ওই জীবাণুদের বাগে আনতে পারে না। তাই ‘সুপারম্যান’-এর
মত তাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপারবাগ’ (‘বাগ’মানে
পোকা)।
ওই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যখন চিকিৎসা ব্যবস্থাই বেশ দুর্বল, সেখানে
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকারী জীবাণুর আবির্ভাব বেশ এক রহস্যময় ব্যাপার নয় কি? তবে
সেই রহস্যেরও সমাধান করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গেছে, ছোটবড় হাসপাতাল, নার্সিং হোম
ও ক্লিনিকের মত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির মেডিক্যাল বর্জ্যের মধ্যে থেকে যায় অ্যান্টিবায়োটিকের
রেশ। নানা দিক থেকে মেডিক্যাল বর্জ্যেরও একটা বড় অংশ জলপথে গিয়ে পড়ছে সুন্দরবনে। আর
সেই সঙ্গে সেখানকার জল আর মাটিতে জমা হচ্ছে ওই অ্যান্টিবায়োটিক। তাদের পরিচিত পরিবেশে
অপরিচিত জীবাণু-নাশক পদার্থের উপস্থিতি টের পেয়েই জীবাণুরা সেটির বিরুদ্ধে নিজেদের
শরীরে পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে।
মাটির নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, অনেক ধরনের জীবাণুর মধ্যে
এই পরিবর্তন ঘটেছে। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ অ্যাম্পিসিলিন প্রতিরোধ করতে পারে। অনেক
আছে যাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্যানামাইসিন বা টেট্রাসাইক্লিন বা ভ্যাঙ্কোমাইসিনের মত অ্যান্টিবায়োটিককে
প্রতিহত করে। আবার কিছু আছে যারা ওই চার ধরনের ওষুধের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে
সক্ষম হয়েছে। ফলে, ওই সব জীবাণু যদি মানুষের শরীরে কোনও রকম সংক্রমণ ঘটায়, তা হলে তাদের
বাগে আনা বেশ কঠিন হবে।
অন্যদিকে আবার সুন্দরবনে অনেক বন্ধু জীবাণুরও সন্ধান পেয়েছেন
ওই গবেষকরা। অ্যাক্টিনো ব্যাক্টিরিয়া বা জীবাণু বলে পরিচিত তারা। সেখানকার সুন্দরী
গাছের শেকড়ে পাওয়া যায় তাদের এবং সেগুলি থেকে নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি
হতে পারে। ওই ব্যাক্টিরিয়া এমন সব পদার্থ নিজেদের শরীরে তৈরি করে যা দিয়ে অন্যান্য
ক্ষতিকারক জীবাণু মেরে ফেলা যায়। তা দিয়ে যক্ষ্মা বা ক্যানসারের ওষুধও তৈরি করা সম্ভব।
প্রফেসর ভট্টাচার্য বলেন, সুন্দরী গাছের শেকড়ে বাসা বেঁধে-থাকা জীবাণুদের নিয়ে আমাদের
দেশে কোনও গবেষণা হয়নি। কিন্তু চিনে এই বিষয়ে অনুসন্ধান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ওই অ্যক্টিনো
ব্যাক্টিরিয়ার সাহায্যে সেখানে তৈরি হয়েছে নানা ওষুধ। আর সারা বিশ্বে সেই ওষুধ বিক্রি
করে চিন আয় করছে কোটি কোটি ডলার।

Comments
Post a Comment