শুক্রতেও কি প্রাণ আছে
শুক্র গ্রহে কি প্রাণ আছে? মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে
কিনা সে সম্পর্কে জল্পনা-কল্পনা আর অনুসন্ধান যখন চলেছে জোর কদমে, তখন শুক্রর ব্যাপারটা
মেঘাচ্ছন্নই ছিল এতদিন। কিন্তু খুব সম্প্রতি শোনা গেল, সেখানেও নাকি প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিলেছে।
পৃথিবীর খুব কাছের গ্রহ শুক্র। রাতের আকাশে চাঁদের পরেই উজ্জ্বলতম
যে হীরের টুকরোটিকে আমরা দেখতে পাই, সেটি শুক্র। সন্ধ্যাতারা নামেই বেশি পরিচিত সে।
বলা হয়, শুক্র খুব সুন্দর। আকারে আকৃতিতে পৃথিবীর সঙ্গে তার অনেক মিল। তাই তাকে পৃথিবীর
যমজও বলা হয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের গ্রহ হলেও, মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সেখানে
বিশেষ অনুসন্ধান চালাতে পারেননি। কারণ, ঘন মেঘ ঢেকে রাখে শুক্রর বায়ুমণ্ডল। ফলে, সেখানে
মহাকাশযান নামানোর কাজটা তেমন সফল হয়নি, যেমনটা হয়েছে আমাদের অন্য প্রতিবেশী, মঙ্গলের
ক্ষেত্রে। সেখানে তো একের পর এক গবেষণা যান পাঠানো হচ্ছে। যেগুলি থেকে আসছে ভুরি ভুরি
তথ্য আর ছবি। তবে, যে মেঘের কম্বল শুক্রকে রহস্যময় করে রেখেছে, সেই মেঘেই নাকি পাওয়া
গেছে এমন কিছু যা, প্রাণের ইঙ্গিত দিচ্ছে ওই গ্রহে।
“শুক্রর মেঘে ফসফিনের আভাস পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে যাই আমরা,” বলেছেনে
এক আন্তর্জাতিক গবেষণার নেত্রী ইংল্যান্ডের কার্ডিফ ইউনিভারসিটির জেন গ্রিভস। কারণ,
ফসফিন নামের গ্যাসটির উপস্থিতি মানে ওই গ্রহের কোথাও না কোথাও এক বিশেষ ধরনের জীবাণু
থাকার সম্ভাবনা আছে। ওই গবেষণায় অংশ নেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও জাপানের বিজ্ঞানীরা।
খুব কম হলেও, যে পরিমাণ ফসফিন শুক্রর মেঘে পাওয়া গেছে তা জীবাণুরাই
তৈরি করতে পারে। অ-জৈবিক উপায়ে, খুব বেশি হলে, ওই পরিমাণের ১০ হাজার ভাগের এক ভাগই
তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন গ্রিভস।
পৃথিবীতে কিছু বিরল জীবাণু আছে যারা খনিজ বা জৈব পদার্থ থেকে
ফসফেট টেনে নিয়ে, তার সঙ্গে হাইড্রোজেন মিশিয়ে তৈরি করে ফসফিন। তারপর ওই গ্যাস তারা
বাতাসে ছাড়তে থাকে, আর সেই ভাবে তা জমা হয় বায়ুমণ্ডলে। বাঁচার জন্য ওই জীবাণুদের পৃথিবীর
আর পাঁচটা প্রাণীর মত অক্সিজেন প্রয়োজন হয় না। অক্সিজেনহীন খুব কঠিন, পরিবেশে বেঁচে
থাকে তারা। তাদের শুধু চাই ফসফেট আর হাইড্রোজেন। আর নিশ্বাসের সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইডের
বদলে ওরা ছাড়ে ফসফিন।
শুক্র বা ভেনাসের সঙ্গে পৃথিবীর কিছু মিল থাকলেও অমিলটাই বেশি।
ওই গ্রহের বায়ুমণ্ডল কার্বন ডাইঅক্সাইডে ভরা। আর তার ওই ঘন মেঘ জলীয় বাষ্পের নয়, সালফিউরিক
অ্যাসিডের মেঘ। সেই মেঘের আলতো ছোঁয়া লাগলেই আমাদের মত প্রাণীরা ঝলসে যাবে।
ওই গ্রহকে কাছ থেকে জানতে মহাকাশে পর পর পাড়ি জমিয়েছিল সাবেক
সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশযান ‘ভেনেরা ল্যান্ডার’। গিয়েছিল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘মারিনা’মহাকাশযানও। ইয়োরোপও পাঠিয়ে ছিল তাদের মহাকাশযান।
কথা ছিল, কয়েক বছর অন্তর শুক্রর মাটিতে নেমে যানগুলি ওই গ্রহ সম্পর্কে পাঠাবে নানা
তথ্য। যা থেকে আরও ভাল করে চেনা যাবে আমাদের আকাশের সাঁঝবাতি সন্ধ্যাতারাকে।
সব মিলিয়ে ৪২ টি অভিযান চালানো হয়েছিল শুক্রকে জানার জন্য।
কয়েকটি যান নেমেও ছিল সেখানে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি সেগুলি। তারই মধ্যে যে তথ্য
সেগুলি পাঠাতে পেরে ছিল, তা থেকে জানা যায় শুক্র ভীষণ গরম। আমাদের সৌরমণ্ডলে সবচেয়ে
গরম গ্রহ ওই শুক্র। তার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পৃথিবীতে তো
কোথাও কোথাও গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁলেই ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে।
তার বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৩% কার্বন ডাইঅক্সাইড। আর বায়ুমণ্ডলের
চাপ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ বেশি। অর্থাৎ, সেখানে পৃথিবীর প্রাণীরা যদি গিয়ে পৌঁছয়,
তা হলে চিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে থাকবে তারা। হেঁটে চলে বেড়ানর কোনও প্রশ্নই
উঠবে না।
অথচ এই হেন বিষম গ্রহের সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘে পাওয়া গেল
এমন এক গ্যাস যা নাকি ওই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত বহন করছে! মহাবিশ্বে মহাকাশে
যে অনন্ত বিস্ময় ছড়িয়ে আছে তার আরও একটির আভাস পাওয়া গেল এই গবেষণা থেকে।

Comments
Post a Comment