আমরাও কি মহেঞ্জোদারো হতে চলেছি?
মনে হচ্ছে আমরা সে দিকেই এগোচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য যেন মহেঞ্জোদারোই
হয়ে ওঠা। এবং এই শতাব্দীর মধ্যেই আমরা যাতে সেখানে পৌঁছে যেতে পারি, তার জন্য আমাদের
চেষ্টায় কোনও খামতিও রাখছি না আমরা। সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল দেখলে তো এমনটাই মনে
হয়।
আজ থেকে ৪৫০০ বছর আগে মহেঞ্জোদারো ছিল এক বিস্ময় নগরী। সিন্ধু
সভ্যতার সেটি ছিল এক উজ্জ্বল জনপদ। শহর হিসেবে মহেঞ্জোদারো ছিল বেশ আধুনিক। সারি সারি
বাড়ি, সোজা সোজা রাস্তা, জল সরবরাহের ব্যবস্থা, পয়ঃপ্রণালী, এমনকি স্নানের জন্য ছিল
সুন্দর বাঁধান এক জলাশয়। দেখলে মনে হয়, বেশ পরিকল্পনা করেই তৈরি করা হয়ে ছিল সেই শহর।
আর ধরে নেওয়া হয়, সেই সুদূর অতীতে যাঁরা ওই উচ্চমানের শহর গড়ে তুলে ছিলেন, তাঁদের জীবনযাত্রাও
ছিল বেশ উন্নত। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে কোনও প্রাসাদের হদিস পাননি। তাই মনে করা হয়
সেখানে কোনও রাজা-রানী ছিলেন না। শহর পরিচালনা করার ভার সম্ভবত ছিল নগরপালদের ওপর।
আর এও মনে করা হয়, তাদের নির্বাচন করত নগরবাসীই। প্রায় ৬০০ বছর ধরে চলেছিল মহেঞ্জোদারোর
স্বর্ণযুগ।
তারপর এক সময়, সময়ের বালিয়াড়িতে হারিয়ে গেল সেই উন্নত শহর।
তাকে হয়ত আর খুঁজেই পাওয়া যেত না, যদি না প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়
আক্ষরিক অর্থেই মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করতেন তেপান্তরের মাঠের তলায় চাপা পড়ে থাকা এক
বিলুপ্ত শহরের অবশেষ।
কিন্তু কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল মহেঞ্জোদারো? নানা জনের নানা মত।
কেউ বলেন, সিন্ধু নদ তার গতি পথ বদলে ফেলে ছিল। তাই জলের অভাবে ক্রমশ নিষ্প্রাণ হয়ে
যায় ওই সভ্যতা। কেউ বলেন হয়ত বা কোনও মহামারী স্তব্ধ করে দিয়ে ছিল মহেঞ্জোদারোর প্রাণ
স্পন্দন। কিম্বা আগ্রাসী মরুভূমি গ্রাস করেছিল চাষের উর্বর জমি। নাকি অশ্বারোহী আর্যদের
আগমনের কারণেই ছারখার হয়ে যায় ওই নগর সভ্যতা? অনেক ধরনের থিওরি আছে, কিন্তু রহস্যের
সমাধান হয়নি।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রচেস্টার ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিরএক গবেষক বলেছেন এক অন্য সম্ভাবনার কথা। তাঁর গবেষণা থেকে তিনি যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন
তা হল ক্লাইমেট চেঞ্জ বা জলবায়ু পরিবর্তনই মহেঞ্জোদারোর বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে
ছিল।
ওই ইন্সটিটিউটের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর নিশান্ত মালিক অঙ্কশাস্ত্রকে
ভিত্তি করে এক বিশেষ গবেষণা পদ্ধতি (ম্যাথম্যাটিকাল মডেল) তৈরি করেন। সেটির সাহায্যে
উনি দেখেন একটা সময় ওই অঞ্চলে (আজকের পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের লারকানা জেলায়) জলবায়ু পরিবর্তন শুরু হয়। আর তার
ফলেই একটু একটু করে এক গভীর প্রাকৃতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয় মহেঞ্জোদারো।
মালিক দেখেছেন যে ওই সভ্যতার উন্মেষের সময় মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতি
এক রকম ছিল। কিন্তু পরে তা ক্রমশ বদলে যেতে থাকে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয় মহেঞ্জোদারোর
অবলুপ্তির পথে যাত্রা। কারণ মৌসুমি মেঘের আসা যাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বৃষ্টিপাত চাষবাস
আর খাদ্য যোগানের বিষয়টি। ফলে, আবহাওয়ার চরিত্র বদল মহেঞ্জোদারোর বিপর্যয়কে অনিবার্য
করে তোলে।
আগেও একটি গবেষণায় সিন্ধু সভ্যতার বিলুপ্তির কারণ হিসেবে জলবায়ু
পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালাচেন স্টেট
ইউনিভারসিটির গবেষণায় বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তন আর সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের
ফলে সিন্ধু সভ্যতার অবসান হয়। গবেষকরা বলেন, অনুকুল পরিবেশ যেমন ওই সভ্যতাকে গড়ে উঠতে
সাহায্য করেছিল, তেমনই আবার প্রতিকুল আবহাওয়া তার ধ্বংসের কারণও হয়ে দাঁড়ায়।
সিন্ধু সভ্যতার মানুষের হাড় নিয়ে গবেষণা করেছিলেন তাঁরা। নগর
সভ্যতা গড়ে ওঠার ফেলে কী কী অসুখ ছড়িয়ে ছিল সেখানে, সেটাই ছিল তাঁদের অনুসন্ধানের প্রধান
বিষয়। গবেষণা শেষে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, আবহাওয়া পরিবর্তন আর সেই সঙ্গে জীবনযাত্রা
কঠিন হয়ে ওঠার ফলে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। তার মধ্যে ছিল অসুখ (যক্ষ্মা,
কুষ্ঠ) আর পারস্পরিক হানাহানি।
ওই রিসার্চের প্রধান গবেষক রবিনস শুগ বলেন, আবহাওয়ার দ্রুত
পরিবর্তন মানুষের ওপর নানা প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সেগুলি কেমন হবে, বিজ্ঞানীদের
পক্ষে তা আগাম জানা সম্ভব নয়।
আজ এত বছর পরে, আমাদের সভ্যতাও কি ওই একই পথে হাঁটছে? জলবায়ু পরিবর্তন যে এখন ঘটে চলেছে তা তো আর অস্বীকার করার উপায় নেই। মেরু অঞ্চল আর পাহাড়ে পাহাড়ে দ্রুত গলে যাচ্ছে বরফ। উষ্ণ হয়ে উঠছে সমুদ্রের জল। বৃষ্টিপাত এলোমেলো হয়ে পড়ছে দেশে দেশে। দাবাণলে ছাই হচ্ছে অরণ্য। উষ্ণায়নের পারদ চড়ছে নিশ্চিত ভাবে। সেই সঙ্গে একের পর এক মহামারি বিপর্যস্ত করছে আমাদের। আর এ সবই হচ্ছে মানুষের আধুনিক জীবনযাত্রার কারণে।
আজকের জলবায়ু পরিবর্তন যে আমাদের অতীতের মহেঞ্জোদারোয় পৌঁছে
দিতে পারে একদিন, তা আমরা হয়ত এখনও বুঝতেই চাইছি না।

Comments
Post a Comment