বাঘের ডেরায় ল্যান্ট্যানার হানা
ভারতের নানা জায়গায় বাঘের আস্তানাগুলি তাদের দ্বারা আক্রান্ত।
চোরা শিকারিদের উৎপাত তো ছিলই। ছিল কল কারখানা, রাস্তাঘাট, কৃষিজমির প্রসার। সেইসঙ্গে
শহরের বাড়তে থাকা সীমানা সঙ্কুচিত করছিল বাঘের বাসস্থান। এখন আবার তার সঙ্গে যুক্ত
হয়েছে এক নতুন বিপদ – ‘ল্যান্ট্যানা’লতা।
ক্রান্তীয় আমেরিকার লতা ‘ল্যান্ট্যানা কামারা’। সুন্দর,
থোকা থোকা ফুল হয় ওই লতানে গাছে। কিন্তু ক্রমশ বিপজ্জনক ভাবে ভারতের জঙ্গলগুলি দখল
করতে বসেছে তারা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা পত্র থেকে জানা গেছে যে, ইতিমধ্যেই বাঘেদের
বাসস্থানের ৪০ শতাংশ জায়গা ওই গাছ দখল করে নিয়েছে। সে সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশকরেছে ‘মোঙ্গাবে’।
বলা হচ্ছে, গাছটি পৃথিবীর ১০টি অত্যন্ত আগ্রাসী গাছেদের মধ্যে
একটি। তারা বেশ নাছোড়বান্দা ধরনের। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় গাছেদের জায়গা দখল করে
নেয় ওরা। শুধু তাই নয়, প্রতিবেদনটি থেকে জানা যাচ্ছে, তারা মাটি থেকে খুব বেশি পরিমাণে
রসদ তুলে নেয়। অন্যান্য গাছেরা তাই খাদ্যের অভাবে ভোগে। আর সেই কারণেই কমতে থাকে তাদের
সংখ্যাও। সেই জায়গায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করে জাঁকিয়ে বসে ল্যান্ট্যানা। এর ফলে যে
কেবল স্থানীয় উদ্ভিদরাই বিপন্ন হয়, তা নয়। জঙ্গলের সেই সব পশুপাখি ও পোকামাকড়, যারা
স্থানীয় গাছপালার ওপর নির্ভরশীল, সঙ্কটে পড়ে তারাও। আর তৃণভোজীরা বিপদে পড়লে, জঙ্গলের
মাংসাশী শিকারি প্রাণীরাও পড়ে বিপাকে। কারণ তারা তৃণভোজীদের খেয়েই বাঁচে। তাছাড়া ল্যান্ট্যানার
সংস্পর্শে এলে, অনেক প্রাণীর শরীরে অ্যালার্জি দেখা দেয়। কোনও কোনও প্রাণী পেটের অসুখে
ভুগতে থাকে। এমনকি তাদের কিডনিও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যার অনিবার্য পরিণাম হল মৃত্যু।
তাই জঙ্গলে জঙ্গলে ল্যান্ট্যানার প্রাদুর্ভাব চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বলছে মোঙ্গাবের
প্রতিবেদন।
আজ থেকে ২০০ বছর আগে, ১৮০০ নাগাদ, ভারতে নিয়ে আসা হয় ল্যান্ট্যানা।
বাগানের শোভা বাড়াতে আনা হয়েছিল তাদের। তবে কবে যে তারা বাগানের ঘেরাটোপ পেরিয়ে মাঠে
ময়দানে ছড়িয়ে পড়ল, তা কেউ খেয়াল করেনি। এখন তারা জঙ্গলে জঙ্গলে অন্যান্য গাছেদের ত্রাস
হয়ে উঠেছে। বড় বড় গাছের কাণ্ড বেয়ে তারা পৌঁছে যাচ্ছে তাদের মগডালে। ছোট গাছেদের আষ্টেপৃষ্ঠে
জড়িয়ে দম বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের। মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে তারা দখল করে নিচ্ছে ঘাসের জমি।
উত্তর ভারতে শিবালিক পর্বতমালা, মধ্য ভারতের জঙ্গলগুলি আর পশ্চিম ঘাটের দক্ষিণ ভাগে
তারা তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে। এগুলি বাঘেদের আস্তানা বলেও পরিচিত।
দেখা যাচ্ছে, গাছটির মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা খুবই বেশি। মধ্য
আমেরিকার যে অঞ্চলে তাদের আদি নিবাস, সেখানকার তুলনায় ভারতের পরিবেশ অনেকটাই আলাদা।
কিন্তু ২০০ বছর ধরে এখানকার জল-হাওয়া, গরম আর আর্দ্রতার সঙ্গে তারা এখন এতটাই একাত্ম
হয়ে গেছে যে, বহু জায়গায় তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এমনকি এই জলবায়ু পরিবর্তনের যুগেও
উষ্ণায়নের সঙ্গে তারা যতটা সহজে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, স্থানীয় গাছপালা ততটা পারছে না।
তাছাড়া, ‘কারেন্ট কনজারভেশন’
পত্রিকায়
দিল্লি ইউনিভারসিটি ও বেনারস হিন্দু ইউনিভারসিটির দু’জন গবেষক
লিখেছেন যে, ল্যান্ট্যানা গাছের পাতায় যে রাসায়নিক পদার্থ থাকে, স্থানীয় গাছেদের থেকে
তা কিছুটা আলাদা। তাই ল্যান্ট্যানার পাতা মাটিতে ঝরতে ঝরতে একটু একটু করে মাটির চরিত্রই
পাল্টে দেয় এবং নিজের চাহিদা মেটানর উপযুক্ত করে তোলে। সেই কারণেই ল্যান্ট্যানার এত
বাড়বাড়ন্ত। আর ওদিকে স্থানীয় গাছেদের পক্ষে বাঁচাই কঠিন হয়ে উঠছে।
আরও একটি গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, এই ল্যান্ট্যানা গাছ হাতিরা
খায় না। অথচ, যে সব গাছ হাতিদের খাদ্য বলে পরিচিত, একটু একটু করে সেগুলির জায়গা দখল
করে নিচ্ছে ল্যান্ট্যানা। দেখা গেছে, জঙ্গলের যে সব জায়গায় ল্যান্ট্যানার ঝাড় বেড়ে
ওঠে, সে সব দিকে হাতিরা তাদের যাওয়া আসা কমিয়ে দেয়।
এই আগ্রাসী গাছকে বাগে আনতে হিমসিম খাচ্ছেন বন কর্মীরা। প্রতি
বছর জঙ্গলে জঙ্গলে ল্যান্ট্যানা উৎখাত অভিযানে বেরন তাঁরা। কিন্তু কাজটা মোটেই সহজ
হচ্ছে না। তাছাড়া বলা হচ্ছে, এক বর্গ কিমি জায়গা ল্যান্ট্যানা-মুক্ত করতে খরচ হচ্ছে
প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা। সেই হিসেবে, ভারতের সব জঙ্গলে যে বিস্তীর্ণ জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে
ল্যান্ট্যানা, সেখান থেকে তাদের নির্মূল করতে লাগবে কয়েক হাজার কোটি টাকা। অনেকেই মনে
করছেন যে, ভারতের জঙ্গলগুলির জীববৈচিত্র বজায় রাখতে হলে এই আগ্রাসী গাছে কে মূল থেকে
উপড়ে ফেলে তাদের বিস্তার রুখতে হবে।

Comments
Post a Comment