স্মুদ হ্যান্ডফিশ আর ফিরবে না - আধুনিক যুগে বিলুপ্ত হল প্রথম মাছ
আমরা কি এক ঘন্টা নীরবতা পালন করব তাদের জন্য? যারা বিলুপ্ত
হয়ে গেল সম্প্রতি। তারা মানে, ‘স্মুদ হ্যান্ডফিশ’ বা মসৃণ-হাতের মাছ। আধুনিক যুগে,
এরাই হল প্রথম মাছের প্রজাতি, যারা পৃথিবী থেকে চলে গেল চিরতরে। এই গ্রহে ওই মাছকে
আর কোনও দিন দেখা যাবে না।
অস্ট্রলিয়ার সমুদ্রের উপকূলে ছিল ওদের বাস। গায়ে ছিট-ছিট দাগ।
চোখ দুটো বড় বড়। আর সামনের পাখনাগুলো হাতের মত। তার সাহায্যে তারা যত না সাঁতরে বেড়াত,
তার চেয়েও বেশি হেঁটে চলে ঘুরত সমুদ্রের মাটিতে। ২০০ বছর আগেও তাদের সংখ্যা ছিল অনেক।
জাল ফেললেই উঠে আসত দু-চারটে।
এক ফরাসি প্রকৃতিবিদ, ফ্রাসোয়াঁ পেরঁ, ১৮০০ সালে একটি নমুনা
সংগ্রহ করেছিলেন। তারা কেমন প্রাণী ছিল, তা জানার জন্য। ওই নমুনাটিই নাকি এখন একমাত্র
সম্বল। বিজ্ঞানের ওয়েবসাইট ‘ফিজ.অরজ’ বলছে ২০০০ সাল থেকে তাদের খোঁজ চলেছিল লাগাতার।
ডুবুরিরা বার বার গিয়ে ছিলেন সমুদ্রের গভীরে ওই মসৃণ হাতওয়ালা মাছের সন্ধানে। তাদের
বাসস্থান তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছিল। যত দূর জানা গেছে, তারা খুব ছড়িয়ে থাকত না। কিন্তু
একটিরও দেখা পাওয়া যায়নি আর কখনও। আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থা আইসিইউএন তাদের অতি বিপন্ন
তালিকায় রেখেছিল অনেক দিন। শেষে মার্চ মাসে, তাদের ওয়েবসাইটে মসৃণ হাতের মাছের নামের
পাশে জুড়ে দেওয়া হয় দু’টি মর্মান্তিক ইংরেজি অক্ষর – EX - অর্থাৎ ‘extinct’ বা বিলুপ্ত।
এই প্রথম একটি মাছের পৃথিবীবাসের লম্বা অধ্যায়ে যবনিকা পড়ল।
পৃথিবীতে ১৪ প্রজাতির হ্যান্ডফিশ ছিল। এখন কমে দাঁড়াল ১৩। তার
মধ্যে চারটি আবার বিশেষভাবে সঙ্কটাপন্ন্। হ্যান্ডফিশরা খুবই নিরীহ প্রকৃতির প্রাণী।
সাতেপাঁচে থাকে না। সমুদ্রের নীচে এক জায়গায় বসে থাকতেই পছন্দ করে। প্রয়োজন হলে তবেই
‘হাত’ চালিয়ে একটু দূরে সরে যায়। তেমনটাই জানা গেছে তাদের সম্পর্কে।
তবুও বিলুপ্ত হল কেন মসৃণ-হাতের মাছ? তাদের তো ধরাও হয় না,
খাওয়াও হয় না। তা সত্ত্বেও তাদের বিলুপ্তির পিছনে মানুষের হাতই খুব স্পষ্ট। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, বাসস্থান ধ্বংসই তাদের বিলুপ্তির প্রধান কারণ। হ্যান্ডফিশ ধরা না হলেও, ঝিনুক
অনেক দেশে খুব সুখাদ্য বলেই গণ্য করা হয়। আর ঝিনুক থাকে সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে থাকে
হ্যান্ডফিশরাও। অস্ট্রিলিয়ায় ঝিনুক একটা খুব বড় ব্যবসার বস্তু। তাই বড় বড় জাহাজ থেকে
ততোধিক বিশাল সব জাল ফেলে, একেবারে সমুদ্রের তলা থেকে বালি চেঁছে তোলা হয় ঝিনুক। তার
ফলে ক্রমাগত ধ্বংস হতে থাকে হ্যান্ডফিশের বাসস্থান। সেই সঙ্গে জালে আটকে অনেক হ্যান্ডফিশ
মারা যায় প্রতি বছর। কিন্তু বিপদ সঙ্কেত দেখানো হলেও, ঝিনুক ধরার কাজে ছেদ পড়ে না।
সমুদ্র এত বিশাল ও সেখানে প্রাণীর সংখ্যা এতই বিপুল যে, সেখানে
কোনও প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, তেমন সম্ভাবনার কথা ভাবাই হত না। কিন্তু এর আগে
সমুদ্রের প্রাণী ক্যারেবিয়ান সিল বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাদের শরীরের তেলের চাহিদা এক শ্রেণীর
মানুষের মধ্যে এতটাই বেশি যে, ওই সিলদের নির্বিচারে শিকার করার ফলে তারা বিলুপ্তই হয়ে
গেল শেষপর্যন্ত। আর এবার, আধুনিক কালে এই প্রথম বিলুপ্ত হল এক প্রজাতির মাছ।
আসলে একটি প্রজাতির বিলুপ্তি মানে তো শুধু সেই প্রাণীটির কেবল
পৃথিবী থেকেই হারিয়ে যাওয়া নয়। সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকেই চিরতরে মুছে যায় তার অস্তিত্ব।
তাই আমরা কি এক ঘন্টা নীরবে বসে ভাববো, বিলুপ্তির পথযাত্রী প্রাণীদের কীভাবে রক্ষা
করা যায়?

Comments
Post a Comment