সংক্রমণ হলে নিজেদের স্যানিটাইজ করে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে পিঁপড়েরাও


বাড়িতে ঢোকার আগে ওরা নিজেদের পরিষ্কার করে নেয়।  সংক্রমণের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ওরা ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ।  আর অসুখের আভাস পেলে, সাবধানতা অবলম্বন করতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে নিয়ম করে। না, মানুষ নয়, ওরা পিঁপড়ে। 

‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা মনুষ্য সমাজে এই সবে, নভেল করোনাভাইরাসের হঠাৎ হানাদারির ফলে, আলোচিত হতে শুরু করেছে।  কিন্তু পিপীলিকা সমাজে সংক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিলেই সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করার নিয়ম চালু আছে ঢের আগে থেকে।‘ডিস্কভার ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত এক লেখা থেকে এ কথা জানা গেছে। 

লেখিকা সোফি পুটকা বলছেন যে পিঁপড়েরা নিজেদের বাসা সংক্রমণমুক্ত রাখার ব্যাপারে অসীম দক্ষতা অর্জন করেছে।  ফলে, তাঁর কথা অনুযায়ী, তাদের সুবিস্তৃত কলোনি বা বাসায় হাজার হাজার পিঁপড়ে এক সঙ্গে বসবাস করলেও, সেখানে মহামারি প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। ছোঁয়াচে রোগ ছড়াতে পারে, তেমন আভাস পেলেই তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য চটপট জরুরি পদক্ষেপগুলি নিয়ে ফেলে।  তাই অসুখে আক্রান্ত হয়ে হাজারে হাজারে পিঁপড়ে পরলোকগমন করেছে, এমনটা দেখা যায় না। উপরন্তু, গবেষণা বলছে অন্য কথা। দেখা যাচ্ছে যে, পৃথিবীর সব স্হলচর প্রাণীর একত্রিত বায়োমাস বা জৈবিক ভর যা, তার প্রায় ১৫-২০ শতাংশই পিঁপড়েদেরঅবদান। অর্থাৎ তাদের মৃত্যু হার কম। তাই তাদের সংখ্যা প্রকৃত অর্থেই অগুনতি। 

ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল ইউনিভারসিটির ন্যাথালি স্ট্রেয়মেইট পিঁপড়েদের নিয়ে গবেষণা করেন। উনি বলেছেন, তাদের অসুখ প্রতিরোধকারী ব্যবস্হাগুলির মধ্যে রয়েছে কাজের দলগুলির মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা। নিজেদের শরীর ও বাসা সংক্রমণমুক্ত করা এবং গাছের রঞ্জক ও নিজেদের শরীরে উৎপন্ন বিষ মিশিয়ে এক জীবাণুুনাশক তৈরি করে ক্ষতিকর জীবাণুগুলিকে মেরে ফেলা।

ডিসকভারের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, সংক্রমণ ঘটলে পিঁপড়েদের আচরণের পরিবর্তন একেবারে এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন স্ট্রেয়মেইট। পিঁপড়ে সমাজে দু’ ধরনের কর্মী আছে। এক দল থাকে বাসায়। তারা রানী আর বাচ্চাদের সেবাযত্ন করে, এবং বাসাটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত রাখে। অপর দলটির কর্মস্হল বাসার বাইরে।  তাদের কাজ খাবার জোগাড় করা। সেই জন্য তাদের বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতেই হয়। তাই ক্ষতিকারক জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি। ‘সায়েন্স’ জার্নালে ২০১৮ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণা পত্রে স্ট্রেয়মেইট বলেছেন, পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যদি বাইরে-নিযুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে সংত্রমণ দেখা দেয়, তাহলে অন্দরমহলের শ্রমিকরা তাদের আচরণ বদলে ফেলে, দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে। আর সেই সঙ্গে চলে বাসাটিকে স্যানিটাইজ করার কাজ। ফলে জীবাণু বেশি ছড়াতে পারে না। একাধিক বাসায় পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতিগুলি এতই কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করা হয় যে, কোনও ক্ষেত্রেই রানী ও বাচ্চাদের আক্রান্ত হতে দেখা যায় না।

ডিস্কভার-এর রিপোর্টে আরও কয়েকটি গবেষণার উল্লেখ আছে। ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনলজি অস্ট্রিয়া-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, কোনও একটি পিঁপড়ের শরীরে সংক্রমণের মাত্রা কতটা তা বুঝেই বাসার মধ্যে তার চারপাশটা কতটা স্যানিটাইজ করতে হবে, সেটা স্থির করা হয়। অর্থাৎ, ইনফেক্‌শান যদি হাল্কা ধরনের হয়, তা হলে তার ব্যবস্হা হয় এক রকম। মানে, ভেন্টিলেটার না দিলেও চলবে।  আর, সংক্রমণ ঘোরতর হলে, বাসা জীবাণুমুক্ত করার জন্য তাদের স্যানিটাইজারটিকে আরও জোরাল করে তোলে তারা।  মানে, এ ক্ষেত্রে আইসিইউতে ভর্তি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

তাছাড়া, বাসায় ঢোকার আগে, তারা নিজেদের পরিষ্কার করে নেয়। এক সময় অনেক বাঙালি গৃহস্থ পরিবারে এমনই এক অলিখিত নিয়ম মেনে চলা হত। দিনের শেষে, অফিস-কাছারি সেরে বাড়ি ফিরে গৃহস্থটি আগেই যেতেন ‘কলতলায়’ বা ‘কলঘরে’। সেখানে হাত-মুখ ধুয়ে, পারলে জামা-কাপড় বদলে, তবেই গৃহে প্রবেশ করতেন। 

পিঁপড়েদের আরও একটি অবাক-করা প্রথার কথা জানা গেল লেখাটি থেকে। অনেক প্রজাতির শরীরে একটি গ্ল্যান্ড আছে, যেটি বিষাক্ত ফরমিক অ্যাসিড তৈরি করে। নতুন বাসা বাননর পর, ওই পিঁপড়েরা সেটিকে জীবাণুমুক্ত বা স্যানিটাইজ করার জন্য তাদের শরীর থেকে ফরমিক অ্যাসিড ছড়াতে থাকে। তার পরই হয় গৃহপ্রবেশ! 

আরও জানা গেছে যে, বাগানের আগ্রাসি পিঁপড়েরা মাঝে মাঝেই তাদের বাসা জীবাণুমুক্ত করতে ফরমিক অ্যাসিড ছড়ায়। আমরা যেমন আমাদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট মশা, আরশোলা, টিকটিকি-মুক্ত করতে ‘পেস্ট কন্ট্রোল’র সাহায্য নিয়ে থাকি, তেমনি আর কি। কিন্তু পোকা-মারার ওষুধ যখন স্প্রে করা হয়, তখন নয় আমরা বাড়ির বাইরে থাকি, নয়তো নাকমুখ ঢেকে রাখতে হয়। আর বাচ্চাদের তো ধারেকাছে আসতেই দেওয়া হয় না। কিন্তু পিঁপড়েরা জোরাল ফরমিক অ্যাসিড ছড়ালেও, বাসায় গুটির মধ্যে যে পিউপা (যা থেকে বাচ্চা পিঁপড়ে জন্মায়)থাকে, সেগুলির কোনও ক্ষতি হয় না। ফরমিক অ্যাসিডের প্রভাব প্রতিহত করার মতো ক্ষমতা তাদের মধ্যেই থাকে।

 


Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস