আম্পানের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছে বাদাবনের প্রহরীরা

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বা বাদাবন পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের উপকূলবাসীদের বিধ্বংসী ঝড়ের হাত থেকে অনেকটাই বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কত দিন আর তারা রক্ষা করতে পারবে আমাদের?

বঙ্গোপসাগর থেকে প্রবল রোষে ধেয়ে আসা সব ঘূর্ণিঝড়ই প্রথম বাধা পায় বাদাবনের কাছে। গাছপালাগুলি শক্ত শেকড়ের জাল বিছিয়ে মাটি কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকে আর ডালপালারা দেওয়াল তুলে ঝড়ের গতি কমানোর চেষ্টা করে।

ফলে, ঝড় যতক্ষণে মোহনা অতিক্রম করে আরও ভেতরে ঢোকে, ততক্ষণে তার গতি বেশ কিছুটা কমে যায়। এই অঞ্চলের উপকূলবাসীদের ক্ষেত্রে, ওই বাদাবন ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

এবারের বিধ্বংসী আম্পান যে দিন এসেছিল, সে দিনও হেতাল, গরান, গর্জন, বাইন, সুন্দরীরা, যারা মিলে মিশে তৈরি করেছে সুন্দরবনের বাদাবন, তারা কয়েক লক্ষ সেনানীর মত বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তার বিরুদ্ধে। উপকূল জুড়ে ওই পদাতিক বাহিনী মোতায়েন না থাকলে, ক্ষয়-ক্ষতি আরও মারাত্মক হতে পারত বলে মনে করা হচ্ছে।

আগেও ঝড় বয়ে গিয়েছিল তাদের ওপর দিয়ে। তবে এবার ভয়ঙ্করতম আম্পানের আক্রমণের মুখেও তারা অটল থেকেছে। বাদাবনের ৩০ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছেরা। এবং এই বনের সদস্য গাছেরা কেউ কোথাও ঝড়ে উপড়ে গেছে, ভূপতিত হয়েছে এমনটা দেখা যায় নি।

সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঘুরে এসে, সে কথাই বললেন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘নেচার এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটি’-র অজন্তা দে। সুন্দরবনে ওই সংস্থাটির উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করেন উনি। অজন্তা দে জানান, কোথাও কোথাও ম্যানগ্রোভের যে অংশটা জলের ওপর ছিল, সেখানে একটু বিবর্ণভাব লক্ষ করা গেলেও, জলের তলার অংশটি একেবারে সবুজই ছিল। কোথাও আবার একদিকের দ্বীপের বাদাবন ঘন সবুজ, তো উল্টো দিকের জঙ্গলে গাছগুলিতে যেন সবুজের একটু ঘাটতি দেখা গিয়েছিল।

কিন্তু বাদাবনের গাছ নয় যেগুলি, সেগুলির অনেকেই হলদে হয়ে গিয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে উনি জানতে পারেন যে, ঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাস বাদে এক ধরনের কুয়াশার মত নোনা জলের স্প্রে ঢেকে দিয়ে ছিল চার দিক। অনেকের অনুমান, বাতাসের সঙ্গে মিশে-থাকা লবণাক্ত জলের ঝাপটা সহ্য করতে পারেনি গ্রামের মিষ্টি জলের গাছেরা।

উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. নিত্যানন্দ ঘোষের অভিজ্ঞতাও একই। আম্পানের পর সুন্দরবনের বেশ কিছু এলাকা ঘুরে এসে তিনি বললেন, সুন্দরবন আছে সুন্দরবনেই। সেখানকার বাদাবন আজও অক্ষত। আম্পানও ধরাশায়ী করতে পারেনি জঙ্গলের সুন্দরী, হেতাল, গরানদের। কারণ, তারা নোনা জলেরই গাছ। যাতে তারা ঝড়ের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে টিকে থাকতে পারে, সে ভাবেই প্রকৃতি তৈরি করেছে তাদের।

বাকিরা সইতে পারেনি তিন-চার ঘন্টা ধরে একটানা তীব্র হওয়ার চাবকানি। সেই চাপ আর ক্লান্তির শিকার হয় তারা। তাদের শরীরের কোষগুলি ক্ষতি্গ্রস্ত হয়। বিঘ্নিত হয় সালোকসংশ্লেষ। উল্টে-পাল্টে যায় ক্লোরোফিলের যৌগিক গঠন। তাই হলদে হয়ে যায় তারা। তবে ওইসব নিষ্প্রাণ পাতা অচিরেই ঝরে যাবে। নতুন পাতার সাজে আবার সবুজ হয়ে উঠবে গাছগুলি, এমনটাই মনে করেন ড. ঘোষ। সুন্দরবনের উদ্ভিদ আর তাদের ঘিরে যে জীবচক্র চলে, তাই নিয়েই গবেষণা করেছেন উনি।

বিশ্বের বিস্ময় উদ্ভিদ বাদাবনের এই প্রহরীরা কি চিরকাল থাকবে? মানুষের কুঠারাঘাত তো আছেই, সেই সঙ্গে আরও কিছু কি বিপন্ন করছে তাদের?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভারসিটির একটি গবেষণা সে রকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, সমুদ্রের জল যে ভাবে বাড়ছে, তাতে পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলের ম্যানগ্রোভগুলি হুমকির মুখে পড়তে চলেছে।

উষ্ণায়নের ফলে, উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে দ্রুত হারে বরফ গলতে থাকায় সমুদ্রের জল বাড়ছে। বলা হচ্ছে, বাড়তে-থাকা সমুদ্রের জলের সঙ্গে বাদাবনের গাছগুলি কতটা মানিয়ে নিতে পারছে তার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু।

আশঙ্কা করা হয়েছে যে, সমুদ্রের জল যদি প্রতি বছর ৬ থেকে ৭ সেন্টিমিটার হারে বাড়ে, তাহলে ওই বাড়তি জলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হবে বাদাবনের গাছগুলির পক্ষে। এখন (বিশ্বজুড়ে লকডাউনের আগে) যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বাতাসে ছাড়া হত, এবং হয়তো আবার হবে, তার ফলে উষ্ণায়নের মাত্রা কমার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই দ্রুত গলবে বরফ, স্ফিত হবে সমুদ্র, আর বিপন্ন হয়ে উঠবে বিশ্বের সব বাদাবনগুলি। তার মধ্যে পড়বে আমাদের সুন্দরবনও। আর এই সঙ্কট প্রকট হবে ২০৫০ সালের মধ্যে, বলছে গবেষণা পত্র। অর্থাৎ হাতে আছে আর মাত্র ৩০ বছর।

অনীশ গুপ্ত

 


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

অন্ধকারকে মানুষ ভয় পায় কেন