আরও পঙ্গপাল, আসছে বিরাট এক ঝাঁক
জুনের শেষে আরও মরু পঙ্গপাল আসছে ভারতে।
ইতিমধ্যেই একটা ঝাঁক পাঁচ রাজ্যের ৪১ জেলায় ঘাঁটি গেড়েছে। এখন
জানা যাচ্ছে, আরও আসছে। এবং যে ঝাঁকটা আসছে, সেটা নাকি বিরাট।
পূর্ব আফ্রিকার শুকন অঞ্চল থেকে আসছে ওই ঝাঁক। রাজস্থানই তাদের
প্রথম গন্তব্যস্থল বলে অনুমান করা হচ্ছে। তারপর তারা কোথায় ছড়িয়ে পড়বে, কে বলতে পারে।
আর ভয়ের ব্যাপার হল, জুনের শেষ থেকেই শুরু হবে চাষের কাজ। তাই সেই সময় দ্বিতীয় এক অতিকায়
পঙ্গপালের ঝাঁক হাজির হলে, চাষের খুব ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একদিকে নভেল
করোনাভাইরাস, যাকে চোখে দেখা যায় না, আর অন্যদিকে আকাশ কালো করে ধেয়ে আসা পঙ্গপালের
দল, দুয়ে মিলে ভারত যেন এক সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়েছে।
পঙ্গপাল এক ধরনের ফোড়িং। এমনিতে সংখ্যা যখন কম থাকে, তখন একা
একা থাকতেই তারা ভালবাসে। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূল হলে, তাদের সংখ্যা বেড়ে যায়। আর তখন
একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে তাদের আচরণে।
মানুষের মস্তিষ্কে সেরোটনিন বলে এক রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়,
যা আমাদের মানসিক অবস্থা আর আচরণকে প্রভাবিত করে। যেমন আমাদের রাগ, হতাশা, আনন্দ, এ
সবের পেছনে ওই সেরোটনিনের হাত থাকে বলে জানা গেছে। আবার একটা নিরীহ, অকিঞ্চিৎকর ফড়িংকে
পঙ্গপালে পরিণত করে ওই বিশেষ পদার্থই। ‘সায়েন্স’ পত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে যে, ওই ফড়িংয়ের
সংখ্যা একটা মাত্রা ছাড়ালে, তাদের শরীরে সেরোটনিনের উৎপাদন বাড়তে থাকে। অর্থাৎ, যখনই
একটা ফড়িং তার আশেপাশে আরও চারটেকে ঘুরে বেড়াতে দেখে, বা গন্ধ শুঁকে তাদের উপস্থিতি
টের পায়, তখনই তার শরীরে সেরোটনিনের মাত্রা বেড়ে যায়। অন্যদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা
ঘটে। আর তখনই তারা তাদের একাকী চলার প্রবণতা ত্যাগ করে দল বাঁধতে শুরু করে। সেই থেকে
তাদের বংশ বৃদ্ধিও হয় দ্রুত হারে। ফলে, একটা ঝাঁকের সদস্য সংখ্যা লাখ ছাড়াতে সময় লাগে
না।
শুধু তাই নয়। নিঃসঙ্গ জীবন ছেড়ে তারা যখন দলবদ্ধ হতে শুরু করে,
তখন তারা নিজেদের রঙও বদলে ফেলে। জন্মগত সবুজ বসন ছেড়ে, তারা কমলা রঙ ধরে। চোখ ও মাথার
পেছনটা হয়ে যায় কুচকুচে কালো। এবং তাদের মস্তিষ্কটাও আগের তুলনায় বড় হয়ে যায়। যেন দেশের
পর দেশ দখল করার লম্বা অভিযানের জন্য যোদ্ধার বেশ ধারণ করে তারা।
মরু পঙ্গপালরা প্রধানত থাকে আফ্রিকার মরু অঞ্চলে, মধ্যপ্রাচ্যআর দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায়। এটি স্বল্প বৃষ্টির অঞ্চল। বছরে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত
হয় না। ওই প্রতিকূল আবহাওয়ায়, তাদের সংখ্যা সীমিত থাকে। তখন মূলত ১৬ দেশে ঘোরাফেরা
করে তারা। কিন্তু বৃষ্টি বেশি হলে, তাদের সংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটে। তখন তারা প্রায় ৬০
দেশে হানা দেয়।
পঙ্গপালের হানা চিরকালই ত্রাসের কারণ। যেখানে তারা হাজির হয়,
সেখানকার খাদ্য শস্য নিঃশেষ করে দেয় নিমেষে। একটা পঙ্গপাল দিনে প্রায় দু গ্রাম খাবার
খায়। পরিমাণটা তুচ্ছ। কিন্তু একটা এক বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত ঝাঁকে প্রায় চার কোটি
পঙ্গপাল থাকে। এবং ৩৫,০০০ মানুষ এক দিনে যে পরিমাণ খাবার খায়, তারাও খায় সেই পরিমাণ
খাবার, বলছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অরগানাইজেশন বা ফাও। আবার এও
দেখা গেছে, বনজঙ্গলের গাছপালা তারা বিশেষ খায় না। তাদের কাছে বেশি প্রিয় হল মানুষের
চাষের ফসল। মানুষের খাদ্য ভাণ্ডার নিঃশেষ করা ছাড়া, আর কোনও রকম মানুষের ক্ষতি অবশ্য
তারা করে না!
কিন্তু মরু পঙ্গপালদের নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। ফাও বলছে, তার
কারণ তারা থাকে এমন সব দুর্গম জায়গায় যেখানে সহজে পৌঁছন যায় না। তাছাড়া যে সব দেশে
তাদের বাস, সেগুলির বেশ কিছুতে যুদ্ধবিগ্রহ লেগে আছে। সেখানে মানুষ পঙ্গপাল ছেড়ে নিজেদের
মধ্যে মারপিঠ করতেই ব্যস্ত। আর কীটনাশক ছড়িয়ে কোটি কোটি পঙ্গপাল মারার ব্যাপারে সায়
নেই পরিবেশবিদ আর বিজ্ঞানীদের। তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাটাই ভারী, মনে করেন তাঁরা।
অনেক দেশে পঙ্গপাল বেশ সুস্বাদু খাবার। জাল ফেলে পঙ্গপাল ধরা
হয় সেখানে। তারপর সেগুলিকে ভেজে বা সেদ্ধ করে খাওয়া হয় বা শুকিয়ে রাখা হয় পরে প্রয়োজন
মত খাওয়ার জন্য। ফাওয়ের কথা অনুযায়ী, একটা শুঁটকি পঙ্গপালে আছে ৬২% প্রোটিন, ১৭% ফ্যাট
আর বাকিটা অন্যান্য পদার্থ।
তাই বলতেই হয়, ক্ষতি করলেও, পঙ্গপাল বেশ পুষ্টিকর। ফাওয়ের পাতায়
পঙ্গপাল রান্না করার কিছু রেসিপিও দেওয়া আছে। আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
(আগের লেখা ‘আম্পান, নিসর্গ, পঙ্গপাল’ পড়ুন)
পিডি
Comments
Post a Comment