আম্পান, নিসর্গ, পঙ্গপাল
দেশজুড়ে নভেল করোনাভাইরাসের সৃষ্টি-করা কোভিড-১৯ অতিমারি তো
চলছিলই। তারই মধ্যে পর পর এল ঘূর্ণিঝড়। পশ্চিমবঙ্গ আর ওড়িশায় বিধ্বংসী আম্পানের তাণ্ডব
শেষ হতে না হতেই আরও এক লণ্ডভণ্ড-করা ঝড়, যার নাম কিনা আবার নিসর্গ, আছড়ে পড়ল মহারাষ্ট্র
আর গুজরাটের উপকূলে।
আম্পান এসেছিল ভারত মহাসাগর থেকে। নিসর্গ এল আরব সাগর বেয়ে।
দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগণার ওপর দিয়ে আম্পান যখন বয়ে যাচ্ছিল, তখন তার গতি ছিল ঘন্টায়
১৫৫-১৬৫ কিমি। কলকাতায় ১১০-১২০ কিমি। আর মুম্বাই শহরকে কিঞ্চিত রেহাই দিয়ে নিসর্গ যখন
রায়গড় জেলায় আঘাত হানল তখন তার গতি ছিল ঘন্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিমি।
এবং পূর্ব আর পশ্চিম ভারতে অল্প দিনের ব্যবধানে দুটি প্রলয়ের
মাঝেই, উত্তর ভারতে শুরু হল এক নিঃশব্দ হানাদারি—পঙ্গপালের আক্রমণ। এই তিনটি প্রাকৃতিক
বিপর্যয় বিচ্ছিন্ন আর স্বতন্ত্র মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা কিন্তু এদের মধ্যে একটা যোগসূত্র
দেখতে পাচ্ছেন। সেটি হল উষ্ণায়ন।
বলা হচ্ছে, সমুদ্রের জলের উষ্ণতা বাড়ছে। তার ফলে, সমুদ্রপৃর্ষ্ঠের
ওপরের বাতাস আগের তুলনায় বেশি গরম হচ্ছে। আর ওই গরম হাওয়া তুলে নিচ্ছে বেশি পরিমাণ
বাষ্প। সেই অধিক বাষ্প উত্তোলনের ফলেই সাগর, মহাসাগরে ঘন ঘন সৃষ্টি হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়।
পৃথিবীর পাঁচটি মহাসাগরের মধ্যে ভারত মহাসাগরের উষ্ণতাই সব
চেয়ে বেশি। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মিটিরিওলজির বিজ্ঞানী রক্সি ম্যাথিউ
কল, এ কথা বলেছেন ‘মোঙ্গাবে.কমকে’। ভারত মহাসাগরকে পূর্ব আর পশ্চিম ভাগে ভাগ করা হয়।।
উনি বলেছেন পশ্চিম দিকের জল যদি পূর্বের তুলনায় বেশি গরম হয়ে যায়, তা হলে ঘন ঘন ঝড়ের
সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কল আরও বলেছেন যে, দু্ দিকের জলের তাপমাত্রার ব্যবধানটা নিরাপদ
সীমার মধ্যেই ছিল যুগ যুগ ধরে। কিন্তু কিছু বছর হল ফারাকটা বেড়েছে। আর ২০১৮ সাল থেকে
তা অতিক্রম করেছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাঁর আশঙ্কা তাপমাত্রার ব্যবধানটা আরও বাড়বে।
সেই সঙ্গে বাড়বে বিধ্বংসী ঝড়ের সম্ভাবনাও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভারসিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসন-এর
এক গবেষণা থেকে সম্প্রতি জানা গেছে যে, পৃথিবীর সর্বত্র সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ
বাড়ছে। বিগত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁরা আরও বলছেন
যে, ঘূর্ণিঝড় স্থলভূমির ওপর দিয়ে আগের তুলনায় এখন ধীর গতিতে এগোয়। ফলে, ভারী বৃষ্টি
আর বন্যার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উইসকনসিনের গবেষকরা বলেছেন, যে ভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা
বাড়ছে, তাতে পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এমনটাই হওয়ার কথা।
তাই সিডর, রেশমি, আইলা, কোমেন, রোয়ানু, মোরা, ফণি, বুলবুল,
আম্পান আর নিসর্গরা যে আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে ঘন ঘন সমুদ্র থেকে উঠে এসে আমাদের ছিন্নভিন্ন
করে দেবে, এমনটা মনে করা যেতেই পারে। নভেল করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন যদিও বা পা্ওয়া
যায় কোনও একদিন, আইলা আর আম্পানদের হাত থেকে আমাদের বাঁচাবে কোন ভ্যাক্সিন?
তাছাড়া, এবার সাইক্লোন একা আসেনি। সঙ্গে এনেছে পঙ্গপাল। এ যেন
প্রকৃতির ভাতে-মারা, পানিতে-মারার রণকৌশল। উত্তর ভারতে পঙ্গপাল অল্পবিস্তর আসে মাঝে
মাঝে। কিন্তু এবার এসেছে একটু আগেই। আর তাদের ঝাঁকটাও বিশাল। ভারতবাসীর কপাল ভাল যে,
উত্তর ভারতে পঙ্গপালদের আবির্ভাবের ঠিক আগেই ফসল কাটা হয়ে গিয়েছিল, বলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার পঙ্গপাল বিশেষজ্ঞ কিথ ক্রেসম্যান।
কিন্তু সাইক্লোনের সঙ্গে পঙ্গপালের সম্পর্ক কি? মোঙ্গাবে.কম-এর
একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে, ২০১৮ সালে ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ভাগে উদ্ভূত দুটি
সাইক্লোনকেই ক্রেসম্যান সাম্প্রতিক পঙ্গপাল বিস্ফোরণের জন্য দায়ী করেছেন। কিছু কাল
ধরে মধ্যপ্রাচ্য আর পূর্ব আফ্রিকায় বাড়তি বৃষ্টিপাত লক্ষ করা যাচ্ছিল, বলেছেন ক্রেসম্যান।
কিন্তু ২০১৮-র ওই দুটি সাইক্লোনের জেরে ওমানের মরুভূমি ও পূর্ব আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে
ভারী বর্ষণ হয়। ফলে সুগম হয়ে যায় পঙ্গপালের বংশবৃদ্ধির পথ। কারণ শুষ্কতা পঙ্গপালের
বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখে। এবং প্রতিকূল পরিবেশে তাদের সব ডিম ফোটেও না। কিন্তু সাইক্লোনের
ফলে ওই অঞ্চলের পরিবেশে জলীয় ভাব দেখা দেওয়ায়, হাজার হাজার সুপ্ত ডিম ফুটে পঙ্গপালের
বাচ্চা জন্মাতে শুরু করে, বলেছেন ক্রেসম্যান।
পঙ্গপালের সেই নতুন প্রজন্মের সদস্যরা তাদের বংশ আরও বাড়িয়ে
তোলে। তারপর, কেনিয়ার শুষ্ক বনের পঙ্গপাল আর ওমানের মরুভূমিতে বেড়ে ওঠা দলটি একে অপরের
সঙ্গে যোগ দিলে সৃষ্টি হয় এক অতিকায় ঝাঁক।
প্রথমে তারা যায় হর্ন অফ আফ্রিকায়। সেখানে জিবওতি, এরিট্রিয়া,
ইথিওপিয়া আর সোমালিয়ার মত দেশে খাদ্য-শস্য প্রায় নিঃশেষ করে দেয় তারা। এবার সেখান থেকে
ওই ঝাঁকের একটা অংশ অনুকূল বাতাসে ভর করে পূব দিকে উড়ান শুরু করে। প্রথমে পাকিস্তান
ও পরে রাজস্থানের থর মরুভূমিতে অবতরণ করে সেটি। সেখান থেকে ওই পঙ্গপাল বাহিনী রাজস্থান,
গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করে। ওই পাঁচ রাজ্যের ৪১ জেলা
এখন তাদের দখলে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, অচিরেই তারা পূর্ব ভারতের দিকেও অগ্রসর হবে।
পিডি

Comments
Post a Comment