ভবিষ্যৎবাণী তো মিলে যাচ্ছে


সাধারণ মানুষ ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নন। আজ থেকে পাঁচ, দশ, পঞ্চাশ বা একশ বছর পরে কি হবে তা জানার উপায় আমাদের নেই। আবার যাঁরা অসাধরণ, যাঁরা দেশ চালান এবং নিজেদের দূরদর্শী বলে মনে করেন, অদূর ভবিষ্যতের ছবিটাও তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। দেখা গেছে, একমাত্র বিজ্ঞানীরাই আগামী দিনে কী থেকে কী হতে পারে, তার একটা বাস্তব-নির্ভর আভাস দিতে পারেন আজকাল। কিন্তু তাঁদের কথা শোনার লোক কম।
  আর শোনার লোক কম বলেই একটা অশরীরি ভাইরাসের হানাদারিতে হতভম্ব মানুষ সব কাজ ফেলে আজ বাড়িতে বসে আছে। অথচ কিছু মানুষের আচরণের ফলে পশু-পাখি থেকে যে মোক্ষম সব ভাইরাস মানুষের মধ্যে ছড়াবে, সেই পূর্বাভাস বিজ্ঞানীরা শুনিয়েছিলেন প্রায় ৪০ বছর আগে। গত কয়েক বছরে, তাঁদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। (পড়ুন আগের লেখা জেনেছি, কিন্তু শুনিনি
  দূরত্ব যাতে বজায় থাকে তার জন্য প্রকৃতি লক্ষণরেখা এঁকে দিয়ে ছিল। বন্যরা থাকবে বনে। মানুষ থাকবে তাদের থেকে দূরে। দুয়ের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হবে যতটা সম্ভব কম। সে ভাবেই প্রকৃতি সাজিয়ে ছিল পৃথিবীকে। আর তাদের খাওয়ার উদ্দেশ্যে খামার গড়ে, কৃত্রিম প্রজননের সাহায্যে প্রাণীদের সংখ্যা বাড়িয়ে, এক অস্বাভাবিক পরিবেশে বড় করে তোলার বিধান প্রকৃতিতে কোনও দিনই ছিল না। কিন্তু সেই নিয়মগুলি ভাঙ্গা হয়েছে অবলীলায়। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও। 
  ফলে, প্রাণীদের থেকে মানুষের দেহে ভাইরাস এসেছে একের পর এক। যেমন:
১। এইচআইভি ভাইরাস আসে শিম্পাঞ্জি থেকে
২। বন বেড়াল থেকে আসে সার্স ভাইরাস
৩। উট থেকে আসে মিডিল ইস্ট রেস্পিরেটারি সিন্ড্রোম বা মের্স
৪। গরিলা আর শিম্পাঞ্জি থেকে এসেছে ইবোলা
৫। শুয়োর থেকে নিপাহ
৬। ঘোড়া থেকে আসে হেন্ড্রা ভাইরাস
৭। আফ্রিকার গ্রিন মাঙ্কি বা সবুজ বাঁদর থেকে আসে মারবার্গ
৮। পাখি থেকে বার্ড ফ্লুর এইচ৫এন১ ভাইরাস
৯। আর এখন বাদুড় থেকে নভেল করোনাভাইরাস মানুষকে পথে বসিয়েছে
  ভাইরাস থেকে যে একটা অতিমারি ঘটবে, বিজ্ঞানীদের সেই আশঙ্কা যেমন ঠিক প্রমাণিত হয়েছে, তেমনই আবার, তাঁরা বার বারই বলছেন যে, উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীতে এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘনিয়ে উঠছে।
  এবং তা যে হচ্ছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনই পেতে আরম্ভ করেছি আমরা। দুই মেরুর বরফ খুব দ্রুত গলছে। গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকায় লক্ষ লক্ষ টন বরফ গলে যাচ্ছে প্রতি গ্রীষ্মে। আবার, যা গলছে, তার পুরটা জমছে না। বরফের পরিমাণ পূরণ হচ্ছে কেবল আংশিক ভাবে। ফলে ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে বছর বছর। সেই ঘাটতি এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, মহাকাশে ভেসে-চলা উপগ্রহের চোখেও তা ধরা পড়ছে এখন।
  মেরু অঞ্চলে আরও একটা বিচলিত করার মতো ঘটনার কথা জানা গেছে সম্প্রতি। ২০১৭ সালে, দশটা কলকাতা মহানগরীর সমান বিশাল এক হিমখণ্ড অ্যান্টার্কটিকার মূল বরফ প্রস্তর থেকে আলাদা হয়ে যায় (আইসবার্গ এ-৬৮)। আর গত মাসে, সেটিরও একটা অংশভেঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ‘সেন্টিনেল-১ উপগ্রহ পাঠিয়েছে সেই ভাঙ্গনের ছবি। জানা গেছে প্রকাণ্ড সেই ১০-কলকাতা সমান হিমবাহটি এখন ভেসে চলেছে উষ্ণতর সমুদ্রের দিকে। অনিবার্য কারণেই সেটি গলবে। আর সমুদ্রপৃষ্ঠ হবে আরও উঁচু। তার পরিণাম কী হবে, তাও বলা হচ্ছে। যেমন, তলিয়ে যাবে অনেক উপকূল অঞ্চল। ডুবে যাবে অনেক দ্বীপ আর দেশ। কিন্তু সেই সতর্কবাণী শুনছে কি কেউ?
  আর আমাদের মাথার ওপর যে হিমালয় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেও এক এক করে ফুটে উঠছে বিপদ চিহ্নগুলি। হিন্দুকুশ পর্বতমালা ছড়িয়ে আছে ভারত, নেপাল আর চিন জুড়ে। তার আয়তন ৩,৫০০ বর্গ কিমি। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে যে, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে তার চেয়েও বেশি হারে বাড়ছে এই পর্বতমালার তাপমাত্রা।
  বিজ্ঞানীরা বলছেন হিন্দুকুশ পর্বতমালায় এখন হিমবাহের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এই তথ্য একটি সুখবর বলে মনে হতে পারে এই উষ্ণায়নের সময়। কিন্তু অশনি সঙ্কেত রয়েছে ওই সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যেই। দেখা যাচ্ছে, একটি বড় হিমবাহ জায়গায় জায়গায় শুকিয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে অনেকগুলি ছোট ছোট হিমবাহ। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, সামগ্রিক ভাবে বরফের পরিমাণ কমছে হিন্দুকুশ পাহাড়ে।
  হিন্দুকুশ পর্বতমালাকে বলা হয় এশিয়ার জলের ট্যাঙ্ক। ওই পাহাড়ের হিমবাহগুলি হাজারও ঝর্ণা ও নদীর মাধ্যমে জল যোগায় প্রায় ২০০ কোটি মানুষ ও অসংখ্য প্রাণীকে। নদীগুলিকে ট্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসা আঁকাবাঁকা পাইপের এক বিস্তৃত জাল হিসেবে কল্পনা করে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি পাহাড়ে তুষার কমতে কমতে এক দিন ওই পাইপগুলিতে জল সরবরাহ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায় একেবারে? তাহলে ২০০ কোটি মানুষ আর অবলা প্রাণীরা কোথায় যাবে জলের খোঁজে? সাধারণ মানুষ সহ বিশ্বের চিন্তাবিদ আর রাষ্ট্রনায়করা কি ভেবে দেখেছেন সেই অভাবনীয় পরিস্থিতির কথা?
  ‘নেচার জিও-সায়েন্স-এ প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রকে উদ্ধৃত করে ‘ডাউন টু আর্থ জানাচ্ছে যে, আগের কিছু ধারণা পাল্টে দিচ্ছে সাম্প্রতিক তথ্য। বলা হচ্ছে, হিন্দুকুশে যে পরিমাণ তুষার মজুত আছে বলে মনে করা হত, এখন দেখা যাচ্ছে আসলে আছে তার চেয়ে ২৭ শতাংশ কম। আরও মনে করা হত যে, ওই পর্বতমালার তুষার ভাণ্ডার অর্ধেক হয়ে যাবে ২০৭০ সাল নাগাদ। কিন্তু সেখানে উষ্ণতা যে হারে বাড়ছে আর সঙ্কুচিত হচ্ছে হিমবাহগুলি, তাতে হিন্দুকুশের তুষার ভাণ্ডার ২০৬০ সালে বা ১০ বছর আগেই অর্ধেক হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
  অর্থাৎ আর ৪০ বছরের মধ্যেই এক অকল্পনীয় জল-সঙ্কট দেখা দেবে ভারত, নেপাল চিনের এক বৃহৎ অংশে।
  সেই সঙ্কট যাতে সৃষ্টি না হয়, তার জন্য এখন থেকেই ব্যবস্থা নেবে কি বিশ্ব? নাকি, ভাইরাসের আগমনী বার্তা যেমন উপেক্ষিত হয়েছিল, এই ভবিষ্যৎবাণীও তেমনি উড়িয়ে দেওয়া হবে।
ছবি: হিন্দুকুশ পর্বতমালা; আইসবার্গ এ-৬৮
পিডি

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

অন্ধকারকে মানুষ ভয় পায় কেন