আম্পান - শোনা যাচ্ছে কি গাছেদের আর্তনাদ



আম্পান চলে গেছে, রেখে গেছে গাছেদের শব। না, ঠিক শব নয়। আহত গাছ সব পড়ে আছে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নিথর দেহ, অথচ তিরতির করে কাঁপছে তার সজীব পাতা। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে, ডাল-পালা যেন শরীর থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে হিংস্র হাওয়া। আম্পান চলে যাওয়ার পর, পড়ে যাওয়া গাছেরা এখনও বেঁচে আছে। তারা কি আর্তনাদ করছে? ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে তারা কি বলছে, আমাদের জল দাও। মাটি দাও। দাঁড় করিয়ে দাও। আবার আমরা বেঁচে উঠতে পারি। কিন্তু তাদের আর্তি শুনতে পা্চ্ছি না আমরা। তা্ই মৃত্যু তাদের অবশ্যম্ভাবী। কলকাতা পূর এলাকাতেই নাকি এ ভাবে এক এক করে মরে যেতে বসেছে ৫০০০ আহত গাছ।
  গাছেদের যে প্রাণ আছে, তা তো জগদীশ চন্দ্র বোস (ছবি)প্রমাণ করে দিয়ে ছিলেন গত শতাব্দীতেই। সেই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আরও বলে ছিলেন, আমদের মতই গাছেদের খিদে পায়। তাদের ব্যাথা লাগে। কথাও বলে তারা। সেই ভাষা আমদের বুঝতে শিখতে হয়।
  জগদীশ চন্দ্র গাছেদের সম্পর্কে যা বলেছিলেন, সে বিষয়ে ইদানীং গবেষণা আরও এগিয়েছে। বিজ্ঞানীরা নানান প্রশ্ন করেছেন নিজেদের আর উত্তর খুঁজেছেন তার। গাছ থেকে ফুলটা ছিঁড়ে নেওয়ায় কি গাছটার লাগল? একটা সবুজ তরতাজা পাতা ছিঁড়ে ফেলায় সে কি ব্যাথায় কেঁপে উঠল? ডালটা কেটে ফেলায় কি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল সে? এ সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বিজ্ঞানীরা। আর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাঁরা জেনেছেন, হ্যাঁ, গাছেরাও ব্যাথা পায়। আর শুধু যে ব্যাথা পায় তাই নয়, আঘাত তেমন গুরুতর হলে তারা তাদের মতো করে আর্তনাদও করতে থাকে। আমরা, সাধারণ মানুষরা, তা শুনতে না পেলেও, জার্মানির বন ইউনিভারসিটির ইনস্টিটিউটঅফ অ্যাপলায়েড ফিজিক্স-এর বিজ্ঞানীরা গাছেদের সেই চিৎকার শুনতে পেয়েছেন।
  আগেই জানা গিয়েছিল যে, এক সাঙ্কেতিক ভাষায় গাছেরা নিজেদের মধ্যে খবর আদান প্রদান করে। পোকার দ্বারা আক্রান্ত হলে তারা বাতাসে তাদের নিজস্ব কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পদার্থ ছড়াতে থাকে, যা অন্য গাছেদের জানিয়ে দেয় সেই হানাদারির কথা। ফলে অন্যরাও তাদের শরীরে পোকা-তাড়ানো পদার্থের উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। 
  কিন্তু গাছেদের ব্যাথা পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে সম্প্রতি।  বন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখেছেন যে, গাছ থেকে ফল বা ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে নিলে, অথবা ডাল কাটলে, রক্তের বদলে তাদের শরীর থেকে গ্যাস বেরতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আনেকটা ঘাস কাটলে একটা বিশেষ গন্ধ আমাদের নাকে আসে। সেটা আর কিছুই নয় প্রচুর ঘাসের কাটা অঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস। শুধু তাই নয়। অতিশক্তিশালী লেজার মাইক্রোফোনের সাহায্যে তাঁরা শুনেছেন গাছেদের ক্ষতস্থান থেকে বেরতে থাকা গ্যাসের শোঁ শোঁ শব্দ, আর তাকেই তাঁরা বলছেন গাছের আর্তনাদ। এবং স্ট্রেস বা চাপ মাপার যন্ত্রের সাহায্যে তাঁরা দেখেছেন, সেই সময় গাছেদের শরীরে স্ট্রেসের মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়।
  অনেকে আবার গাছেদের ব্যাথা অনুভব করার তত্ত্বটা মানতে রাজি নন। তাঁরা বলছেন যে, গাছের তো মস্তিষ্কই নেই, তাহলে ব্যাথা অনুভব করবে কি করে তারা? কিন্তু অন্য এক দল বিজ্ঞানী, যাঁরা গাছের অনুভূতি নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁরা বলছেন যে, জীব জন্তুর মত তাদের কোনও এক নির্দিষ্ট একটি অঙ্গকে মস্তিষ্ক বলে চিহ্নিত করা না গেলেও, গাছেরা কিন্তু বেশ বুঝেসুঝে ভেবে চিন্তে কাজ করে।  বলা হয় দিকপাল প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন, যিনি প্রাণীজগৎকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছিলেন, তিনি তাঁর জীবনের শেষের দিকে গাছের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন।  গাছেদের সম্পর্কে উনি বলেছিলেন, তাদের বুদ্ধির ভান্ডার মাথায় নয়, রয়েছে শেকড়ে।
  একালের গবেষকরা ডারউইনের সেই উপলব্ধিকেই নানা ভাবে সমর্থন করে চলেছেন। একটা সময় ছিল যখন বিশ্বের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাসই করতেন না আর পাঁচটা প্রাণীর মতো গাছেদেরও অনুভব শক্তি আছে। তাঁদের সেই ভুল ভেঙ্গে দিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। কলকাতায় তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার ফল দেখিয়ে দেয়, গাছেরা ঠান্ডা, গরম, আলো, অন্ধকার এবং শব্দ অনুভব করতে পারে। তাঁর তৈরি বিশেষ যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ-এ ধরা পড়ে আহত গাছের শরীরের তিরতিরে কম্পন। গাছ নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণার শেষে জগদীশচন্দ্রের মনে হয়েছিল গাছেরা ব্যাথা অনুভব করে, স্নেহ ভালবাসা বুঝতে পারে।
  বন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা আজ যা জেনেছেন তা জগদীশ বসুর প্রায় একশ বছর আগেকার গবেষণা-অর্জিত ফলকেই সমর্থন করে। আজকের উদ্ভীদ-বিজ্ঞানীরা বলছেন সুস্পষ্ট একটি মস্তিষ্ক ছাড়াই, গাছেরা এমন সব কাজ করে থাকে যা বুদ্ধিধর প্রাণীর পক্ষেই করা সম্ভব। যেমন, তারা বুঝতে পারে মাটিতে সঞ্চিত জল কোথায় কতটা আছে, কোথায় মজুত আছে খাদ্য, কোথায় ছড়িয়ে আছে বিষাক্ত পদার্থ, বন্ধু জীবাণু আছে কত, এমনকি পাশের গাছটি তার সমগোত্রীয়, নাকি অন্য প্রজাতির কেউ, তাও তারা বুঝেতে পারে।
  বিজ্ঞানীরা বলছেন বাঁচার রসদ নিয়ে ভিন্ন প্রজাতির গাছেদের মধ্যে সাধারণত রেষারেষি চলতে থাকে। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেছে একই টবে একই প্রজাতির কয়েকটি গাছ রাখায় তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তি কমে যায়।  বরং যা আছে তা মিলেমিশে ভাগ করে নেয় তারা। তাই এক দল বিজ্ঞানী আজ বলছেন গাছেদের অনুভূতি যেমন আছে, তেমনই আছে “দেখে বুঝে” সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যা এক বিশেষ বুদ্ধিরই পরিচয় দেয়।
এমনই হাজার হাজার বুদ্ধিধর গাছ বিধ্বংসী আম্পানের আঘাতে আজ রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে, বাগানের চারপাশে আহত হয়ে পড়ে আছে। প্রাণ আছে এখনও। করাত না চালিয়ে, বাঁচানো যেত কি তাদের?
পিডি
 


Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস