আমেরিকার নভেল করোনাভাইরাস কিছু বলছে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নভেল করোনাভাইরাস একটা বার্তা পঠিয়েছে।
তাতে সে দেশের সমাজ সম্পর্কে একটা ছবি আছে। আর আছে কিছু পরামর্শ।
১৭ এপ্রিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স ইউনিভারসিটিএকটি সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, সে দেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তদের
মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলি থেকে আসা অভিবাসী, এশিয় জনগোষ্ঠি ও স্থানীয়
রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে মৃত্যুহার শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোলও একই ধরনের
অনুপাতহীন পরিসংখ্যানের দিকে ইঙ্গিত করেছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, সে দেশে কৃষ্ণাঙ্গদের
জনসংখ্যা ১৩ শতাংশ হলেও নভেল করোনাভাইরাসের আক্রমণে তাঁদের মৃত্যুহার সামগ্রিকের প্রায়
৩৩ শতাংশ।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটি রিপোর্ট বলছে, কোথাও কোথাও ওই মৃত্যুহার
আরও বেশি। যেমন, সে দেশের একটি রাষ্ট্র উইসকনসিন। সেখানকার জনসংখ্যার মাত্র ৬.৭ শতাংশ
হলেন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। কিন্তু কোভিড-১৯-এ যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের ৩৬ শতাংশ হলেন কৃষ্ণাঙ্গ।
আরও দুটি জায়গার কথা উল্লেখ করেছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক – শেলবি
কাউন্টি ও টেনেসি। এই দুই জায়গার জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ হলেন কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্তু মৃতদের
মধ্যে তারাই হলেন ৭০ শতাংশ।
জন হপকিন্স ইউনিভারসিটির প্রফেসর ডঃ লিজা এ কুপার এই প্রবণতার
কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এর জন্য এই গোষ্ঠীগুলির দারিদ্র একটা বড় কারণ। তাঁর
মতে, এঁদের মধ্যে হৃদরোগ, ডায়েবিটিস, অধিক রক্তচাপ, মোটা হওয়ার প্রবণতা এবং মানসিক
রোগ শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বেশি।
তাছাড়া, এঁরা থাকেন ঘিঞ্জি পরিবেশে। খেলাধুলো করার সুযোগ কম।
ঘন ঘন বাজারে যেতে হয় তাঁদের, যেহেতু একসঙ্গে বেশি পরিমাণে জিনিস কেনার সামর্থ নেই।
ফলে, জনসংখ্যার নিরিখে, তাঁদের সংক্রমণ আর মৃত্যুহার দুইই বেশি।
তাহলে দারিদ্রের কারণেই কি ওঁরা ওই সব ব্যাধির শিকার? আর তাই
কি নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ে শারীরিকভাবে খানিকটা অশক্ত তাঁরা?
‘আমেরিকান জার্নাল অফ পাবলিক হেল্থ’ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র
থেকে জানা যাচ্ছে যে, সমস্যাটা আরও জটিল। শুধু দারিদ্র নয়। তার চেয়েও বড় কারণ, তাঁদের
খাদ্যাভ্যাস। গরিব বলে টাটকা খাবার কেনার সামর্থ নেই তাঁদের। প্রসেস-করা প্যাকেট খাবারের
দাম কম। ফলে, সেই খাবারই বেশি খেয়ে থাকেন ওই গোষ্ঠীর মানুষজন। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে
যে, ওই ধরনের প্রক্রিয়াকরণ-করা খাবারের খাদ্যগুণ কম। পেট ভরায়, কিন্তু পুষ্টি যোগায়
না। উপরন্তু সেগুলি মোটা হওয়া থেকে শুরু করে শরীরে নানা অসুখ বাঁধায়। শুধু তাই নয়,
বিপুল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁদের ওই ধরনের জাঙ্কফুড বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে উৎসাহিতও
করা হয়েছে দশকে দশকে।
ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, কৃষ্ণাঙ্গ বাচ্চা ও বড়দের মধ্যে
মোটা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বেশি। সেই সঙ্গে ডায়েবিটিস, হৃদরোগ ও
রক্তচাপজনিত অসুখ, এবং কয়েক ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এগিয়ে তাঁরা। কারণ, স্বাস্থ্যকর
খাবার কেনার সামর্থ শ্বেতাঙ্গদের বেশি।
কিন্তু কী করলে এই অবস্থা বদলান যাবে? তারও উপায় বলা হয়েছে
ওই গবেষণাপত্রে। ওই সব অসুখ দূরে রাখতে হলে, বর্জন করতে হবে সেই সব খাবার আর পানীয়
যাতে ক্যালরি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও নুনের মাত্রা বেশি। পরিবর্তে খেতে হবে ফল, সব্জি,
আস্ত চাল-গমের তৈরি খাবার এবং কম ফ্যাট-যুক্ত দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারতে ছবিটা ঠিক উল্টো। এখানে
দরিদ্র বা যঁদের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়, তাঁরা প্রসেস-করা, প্যাকেটে-পোরা খাবার খান
না। সেগুলির দাম বেশি। এখানে তাঁরা মূলত খান হাতে-গড়া আটার রুটি, ভাত, ডাল, আর সব্জি।
সম্ভব হলে সঙ্গে দুধ বা দই।
এ দেশে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তরাই প্যাকেটজাত খাবার খেয়ে থাকেন
বেশি।
পিডি

Comments
Post a Comment