করোনা - কেউ বেশি, কেউ কম কেন
কেউ বেশি, কেউ কম - এমনটা হচ্ছে কেন? কারণ, একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে রোগীদের
শরীরে, যার দাপট সমলাতে পারছেন না অনেকেই।
দেখা যাচ্ছে, নভেল করোনাভাইরাসের দ্বারা যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে
অনেকে অল্পেই পার পেয়ে যাচ্ছেন, আবার অনেককে ভারী মাশুল গুনতে হচ্ছে। কেউ কেউ শরীরে
নভেল করোনাভাইরাসকে নিয়ে দিব্বি দিন কাটাচ্ছেন। নিজে টেরও পাচ্ছেন না যে, ওই ভাইরাস
তাঁর শরীরে আত্মগোপন করে আছে। আবার অনেকে অসুস্থ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আইসিইউতে
চলে যাচ্ছেন। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার খবর যেমন আসছে, তেমনই মৃত্যুর খবরও আসছে প্রতিদিন। নভেল করোনার এই বৈষম্যমূলক
আচরণ কেন?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোলাম্বিয়া ইউনিভারসিটিতে মেডিসিনের অ্যাসিস্ট্যান্ট
প্রফেসর সিদ্ধার্থ মুখার্জির মতে, এটাই এই ভাইরাসটির রহস্যময় দিক, যা তাকে এতটা মারাত্মক
করে তুলেছে।
সিদ্ধার্থ মুখার্জি শুধু একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীই নন, একজন প্রখ্যাত লেখকও।
ক্যানসারের ওপর তাঁর বই ‘এম্পারার অফ অল ম্যালাডিজ’ তাঁকে পুলিৎজার প্রাইজ
এনে দেয়। ‘ইন্ডিয়া টুডে’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উনি বলেছেন, কোনও
রকম জানান না দিয়েই আমাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকতে পারে নভেল করোনাভাইরাস।
নিজেদের মধ্যে তার অস্তিত্ব আমরা টের পাই না, আর সেই কারণেই সংক্রমণ ছড়াতে পারি আরও
তিনজনের মধ্যে। তাঁর মতে, এই ভাইরাস থেকে সংক্রমণের হার শূন্যে নামিয়ে আনা অত্যন্ত
জরুরি। একটা উদাহরণ দিয়ে উনি বলেছেন, নভেল করোনাভাইরাসকে যদি কোনও বাধা না দেওয়া হয়,
তাহলে একজন ব্যক্তিই সারা বিশ্বের মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
এই ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।
‘অ্যাটলান্টিক’পত্রিকার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ইটালিতে ৪৩ শতাংশ সংক্রমিত
মানুষের মধ্যে কোনও উপসর্গ দেখা দেয়নি। সংক্রমিতদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ বোধ করেছেন,
চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন, আবার হঠাৎই চলে গেছেন জীবন-মরণের সীমানায়। আবার এমনও ব্যক্তি আছেন,
যাঁরা হাল্কা জ্বর-জ্বালা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর, চটপট ভাল হয়ে উঠেছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাস যে কোভিড-১৯ অসুখ সৃষ্টি করে, তার কোনও
ওষুধ এখনও নেই। তাই প্রতিটি ব্যক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে অসুখ
কোন দিকে মোড় নেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্ট ইউনিভারসিটির চিকিৎসা বিজ্ঞানী
ও সেন্টার ফর গ্লোবাল কমিউনিকেবল ডিজিজেস-এর ডিরেক্টর প্রফেসর রবার্ট মার্ফি অ্যাটলান্টিককে
বলেছেন, প্রতিটি মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা আলাদা। তাই কে কী ভাবে এই অসুখের মোকাবিলা
করবে, তাও হবে ভিন্ন।
মার্ফি বলেছেন, এটা খুবই অস্বাভাবিক। অন্য কোনও অসুখের ক্ষেত্রে এতটা তারতম্য
লক্ষ করা যায় না। এর জন্য হয়তো ভাইরাসটি যত না দায়ী তার চেয়েও বেশি দায়ী প্রতিটি রোগীর
নিজস্ব শারীরিক অবস্থা, মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে কোভিড-১৯-এ আক্রান্তের ও মৃতের সংখ্যা বিশ্বে
সবচেয়ে বেশি, সেখানে চিকিৎসকরা বলছেন যে সংকটাপন্ন রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে পাওয়া
যাচ্ছে এমন কিছু সূচক যা থেকে বোঝা যায় যে, তাঁদের শরীরে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
ঝড়টার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’বা সাইটোকাইনের ঝড়।
সাইটোকাইন হল এক ধরনের মলিকিউল। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ওই মলিকিউল পাঠায় ভাইরাসটিকে
প্রতিহত করতে।
পৃথিবীর ডায়েরি’র আগের একটি লেখা, ‘গেরিলা ভাইরাস’-এ বলা হয়েছিল নভেল
করোনাভাইরাস কী ভাবে শরীরে প্রবেশ করার পর আক্রান্ত কোষগুলির বিপদ সংকেত পাঠানোর ক্ষমতাকে
নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে, উপসর্গ ফুটে ওঠার আগে পর্যন্ত, শরীরে যে ভাইরাসেরই হামলা হয়েছে, তা টের পায় না
প্রতিরোধ ব্যবস্থা। টনক নড়ে একটু দেরীতেই। তা ছাড়া, ওই অচেনা ভাইরাস কোথায় লুকিয়ে আছে,
তাও বোঝা যায় না। তখন শরীরের অপ্রস্তুত সেনা নায়করা লাখে লাখে সাইটোকাইন মলিকিউল ছেড়ে
দেয়। তারাই আবার কোটি কোটি অন্য ঘুমন্ত সৈনিকদের জাগিয়ে তোলে। আর সেই সঙ্গে শরীরের
ভেতরে শুরু হয় এক মহাযুদ্ধ। গলা, ফুসফুস এবং অন্যান্য অঙ্গের কোষে লুকিয়ে থাকা ভাইরাস
বাহিনীকে নির্মূল করতে গিয়ে, অতি সক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা আঘাত করতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ
অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির সুস্থ-সবল কোষগুলিকেও।
ফলে, কারও যদি ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, যকৃত বা কিডনি ইতিমধ্যেই অন্য নানা কারণে
দুর্বল হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে ওই সাইটোকাইনের ঝড়ে সেগুলি আরও নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
আর সেগুলির অকেজো হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায় অনেক গুণ। সে ক্ষেত্রে পরিণাম হয় মর্মান্তিক।
তাই শরীরকে রোগমুক্ত রাখা খুবই জরুরি।
পিডি

Comments
Post a Comment