ভয়ঙ্কর এক ডজন ভাইরাস
ভাইরাসরা এতই ছোট যে তাদের শরীরই নেই। তারা হল ডিএনএ বা আরএনএ
সম্বলিত একটি মলিকিউল মাত্র, যা এক ধরনের প্রোটিনের চাদরে মোড়া থাকে। তারা যে কত ছোট,
তার আন্দাজ পেতে হলে কল্পনা করতে হবে একটি ছুঁচের ডগা। সেই ছুঁচের ডগায় এক সঙ্গে গা
ঘেঁষাঘেঁষি করে বসতে পারে ৫০ কোটি ভাইরাস। এতটাই ছোট তারা!
তাছাড়া ভাইরাসের আরও একটা বৈশিষ্ট্য হল তাদের নিজস্ব কোনও বাসস্থান
নেই। ঘর ভাড়া নেওয়া বা দখল করা ছাড়া উপায় নেই তাদের। অর্থাৎ, অন্য কোনও প্রাণীর কোষের
মধ্যে ঢুকতে পারলে তবেই তারা বাঁচে ও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। খোলা হাওয়া বেশি ক্ষণ সহ্য
হয় না ওদের।
মানুষ আর ভাইরাস পৃথিবীতে এক সঙ্গে বাস করছে অনেক কাল। কিন্তু
ভাইরাস বলে যে এক রহস্যময় প্রাণী মানুষকে বারবার শয্যাশায়ী করে, তা জানা গেল ১৯০১ সালে।
‘রয়াল সোসাইটি পাবলিকেশনস-এর ফিলজফিক্যাল ট্রানস্যাকশনস-বি’র
এক প্রকাশনা থেকে জানা যাচ্ছে যে, মানুষকে সংক্রমিত করে এমন যে ভাইরাসটি প্রথম আবিষ্কার
হয়, সেটি হল ‘ইয়েলো ফিভার’ বা পীত জ্বর সৃষ্টিকারী ভাইরাস। তারপর থেকে প্রতি বছরই দুটো-চারটে
করে নতুন ভাইরাস আবিষ্কার হয়েছে। মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ঘটায় এমন ২১৯ ভাইরাসের সন্ধান
মিলেছে এ পর্যন্ত।
তারা নানা ধরনের অসুখ বাধায়। তবে অধিকাংশই অল্পবিস্তর হাঁচি-কাশি
জ্বরজ্বালা ঘটানোর কয়েকদিনের মধ্যেই মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা আর ওষুধের যৌথ
অভিযানের মুখে রণে ভঙ্গ দেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে গোটা ১২ হল বেশ মারাত্মক। অক্রমণ করে
বসলে, তাদের সহজে টলানো যায় না। বহু ক্ষেত্রে একটা মরণপণ লড়াইয়ের পর আক্রান্ত মানুষটিই
শেষমেশ হেরে যান।
ওই বারো বোম্বেটেরা কারা? ‘লাইভসায়েন্স’-এর মতে এরা হল: মরবুর্গ,
রেবিস, ইবোলা, এইচআইভি, গুটি বসন্ত, হান্টাভাইরাস, ইনফ্লুয়েনজা, ডেঙ্গু, রোটা, সার্স-কভ,
মের্স-কভ ও সার্স-কভ-২ ভাইরাস।
১। মরবুর্গ ভাইরাস: ১৯৬৭ সালে, জার্মানির একটি ল্যাবরেটারির
কর্মীরা আক্রান্ত হন এর দ্বারা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আফ্রিকার উগান্ডা থেকে কিছু
বাঁদর নিয়ে আসা হয় জার্মানির মরবুর্গ শহরের ওই ল্যাবরেটারিতে। তাদের থেকেই ভাইরাসটি
ছড়ায়। আক্রান্ত হলে হু হু করে জ্বর বাড়ে। শরীরের নানা ইন্দ্রীয় থেকে রক্তক্ষরণ হতে
থাকে। প্রথমে, জার্মানিতে এই ভাইরাসের আক্রমণ ঘটে। তার পর ১৯৯৮-২০০০ সালে কঙ্গোয়। আর
২০০৫ সালে অ্যাঙ্গোলায়। এই জ্বরে মৃত্যু হার খুব বেশি।
২। রেবিস ভাইরাস: রেবিস বা জলাতঙ্ক। রেবিস আক্রান্ত প্রাণীর কামড়
বা লালা থেকে ছড়ায়। এর ভ্যাক্সিন বেরয় ১৯২০ সালে। পোষ্যদের এই ভ্যাক্সিন দেওয়া থাকলে
রেবিস হয় না তাদের। প্রয়োজনে মানুষকেও ভ্যাক্সিন নিতে হয়। চিকিৎসা শাস্ত্র বলে, রেবিস
যদি হয়, তাহলে বাঁচা প্রায় অসম্ভব। ‘প্লস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যাচ্ছে
যে, ২০১৬ পর্যন্ত বিশ্বে মাত্র ১৫ রেবিস আক্রান্ত মানুষ সুস্থ হয়ে উঠতে পেরেছেন।
৩। ইবোলা ভাইরাস: ১৯৭৬ সালে সুদান ও কঙ্গোতে একই সঙ্গে হানা
দেয় এই ভাইরাস। সংক্রমিত মানুষ বা অন্য প্রাণীর শরীরের রস-কষ থেকে ছড়ায় এরা। তবে সব
ইবোলা ভাইরাসের চরিত্র এক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওই ভাইরাসের একটি প্রজাতি
একেবারেই নিরীহ। আবার অন্য একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর।
৪। এইচআইভি: ১৯৮০-র দশকে দেখা দেয়। শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষের
মধ্যে ছড়ায় এই ভাইরাস। মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়
এরা। ফলে, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে হাজারও অসুখ বাসা বাঁধে। এখন জোরাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণে
রাখে ওই ভাইরাসকে। তবে নির্মূল করা যায় না এখনও।
৫। গুটি বসন্ত: যুগ যুগ ধরে মানুষের ত্রাস ছিল এই অসুখ। আক্রান্তদের
মধ্যে মৃতের হার হত খুব বেশি। বিবিসির একটি প্রতি্বেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে
এক-তৃতীয়াংশই মারা যেতেন এই অসুখে। এবং গত শতাব্দীতে, সারা বিশ্বে ৩০ কোটি মানুষ মারা
যান এই ভাইরাসের আক্রমণে। ১৯৮০ সালে, পৃথিবী এই ভাইরাস-মুক্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করে বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থা।
৬। হান্টাভাইরাস: প্রথম দেখা দেয় দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেখানকার
হান্টান নদীর চারপাশের অঞ্চলে। ১৯৭৬ সালে সে দেশের ভাইরোলজিস্ট হো ওয়াঙ্গ লি ভাইরাসটিকে
শনাক্ত করেন। দু’ধরনের অসুখ সৃষ্টি করে এরা – খুব জ্বরের সঙ্গে শরীরে রক্ত ক্ষরণ এবং
প্রবল নিঃশ্বাসের কষ্ট। এই ভাইরাসের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, এক প্রজাতির ইঁদুর থেকে
আসে ওই ভাইরাস। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। ইঁদুরগুলির মধ্যেও কোনও অসুখ দেখা দেয় না।
কিন্তু তাদের কামড় খেলে বা পেচ্ছাব বা বিষ্ঠার সংস্পর্শে এলে মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস
ছড়ায়।
৭। ইনফ্লুয়েনজা: ছিল, আছে, এবং সম্ভবত থাকবেও। বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বছর ৫ লক্ষ মানুষ মারা যান ইনফ্লুয়েনজার প্রকোপে। ইনফ্লুয়েনজার
সব চেয়ে মারাত্মক নিদর্শন হল ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। গত শতাব্দীতে, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের
শেষের দিকে দেখা দেয় এই ফ্লু। আনুমানিক ৫ কোটি মানুষ মারা যান এই অসুখে।
৮। ডেঙ্গু: মশা থেকে ছড়ায়। এক সময় আফ্রিকা ও এশিয়ার জঙ্গলেই
সীমাবদ্ধ ছিল। মশার কামড় খেয়ে ডেঙ্গু হত বাঁদরদের। পরে, মানুষ জঙ্গল ধ্বংস করতে থাকলে,
বন্য ভাইরাস মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ‘এডিস’ প্রজাতির মশা, মূলত গ্রীষ্ম প্রধান দেশে
এই ভাইরাস ছড়ায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল বলছে পৃথিবীতে ১০০
দেশে এখন এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন দেশে পাড়ি
দিচ্ছে তারা।
৯। রোটাভাইরাস: বাচ্চাদের আক্রমণ করে। পেটের অসুখ বাঁধিয়ে দেয়।
বিষ্ঠা থেকেই ছড়ায় এই ভাইরাস। অনুন্নত দেশে রোটাভাইরাসের রমরমা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
বলেছে পাঁচ বছর বয়সের কম এমন ৪,৫৩,০০০ শিশু এই ভাইরাসের সংক্রমণে মারা যায় ২০০৮ সালে।
১০। সার্স-কভ: করোনা গোত্রের ভাইরাস। আবির্ভাব ২০০২ সালে। বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এর উৎস চিনের গুয়াংডং রাজ্যে। বাদুড় থেকে বন বেড়াল হয়ে মানুষের
শরীরে প্রবেশ। লাইভসায়েন্স বলছে, চিন থেকে ২৬ দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। ৮,০০০ মানুষ
সংক্রমিত হন। মারা যান ৭৭০।
১১। মের্স-কভ: করোনার আরও এক প্রজাতি। মিডিল ইস্ট রেসপিরেটারি
সিন্ড্রোম (মের্স) সৃষ্টিকারী এই ভাইরাস ২০১২ সালে সৌদি আরবে ও ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায়
আঘাত হানে। অনুমান, এরও উৎস সেই বাদুড়। বাদুড় থেকে উটের পিঠে চড়ে মানুষের কাছে পৌঁছে
ছিল এরা। মের্স-এর মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ বলছে লাইভসায়েন্স।
১২। সার্স-কভ-২: নভেল করোনাভাইরাসের সাম্প্রতিকতম অবতার। উৎস,
চিনের উহান শহর। উৎস, আবারও নাকি সেই বাদুড়। তবে সেই শহরের বাজার না গবেষণাগার থেকে
ছড়িয়েছে, তাই নিয়ে রয়েছে তীব্র মতান্তর। তবে সার্স-কভ-২ দেখিয়ে দিয়েছে সে এক ‘সুপার’
ভাইরাস। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বে সব কোণে পৌঁছে গেছে সে। সারা বিশ্বকে করেছে
সংক্রমিত। আর মানুষকে করেছে গৃহবন্দি।
পিডি
ছবি: ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপে তোলা নভেল করোনাভাইরাস

Comments
Post a Comment