গেরিলা ভাইরাস
ভাইরাসের তো মাথাও নেই, মুণ্ডুও নেই। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের
আক্রমণের কৌশল সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা থেকে বেশ পাকা মাথার হানাদার
বলেই মনে হয় তাকে। শুধু তাই নয়, অনেকটা যেন গেরিলা কায়দায় সে হঠাৎই আক্রমণ করে। সে
কথায় পরে আসছি। তার আগে এই করোনার বংশপরিচয়টা একটু জেনে নেওয়া যাক।
কোভিড-১৯ অসুখটা সৃষ্টি করে একটি করোনাভাইরাস - এসএআরএস সিওভি-২
বা সার্স-কভ-২ (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম করোনাভাইরাস-২) ।করোনাভাইরাস
একটি নয়, অনেকগুলি আছে। সেগুলি সবই একটি বিশেষ গ্রুপের ভাইরাস, যারা প্রাণীদের আক্রমণ
করে, তা সে ময়ূরই হোক বা তিমি।
এই ভাইরাসগুলির নাম করোনা হওয়ার কারণ আছে। ইংরেজি শব্দ ‘করোনা’র মানে,
‘আলোকমণ্ডল’। যেমন, সূর্যর চারদিকে যে আলোর বলয় থাকে, তাকে করোনা বলা হয়।
সার্স-কভ বা করোনাভাইরাসের চারপাশেও একটা বলয় লক্ষ করা যায়। সেটা কোনও আলোর বৃত্ত নয়।
বরং ওই ভাইরাসের শরীর থেকে বেরিয়ে-থাকা লম্বা লম্বা ছুঁচের মত প্রোটিনের অংশ, যেগুলি
যেন একটা জ্যোতির্বলয় সৃষ্টি করে ভাইরাসটির চারপাশে। তাই নাম, করোনাভাইরাস।
২০০৩ সালে দেখা দিয়েছিল সার্স-কভ (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি
সিন্ড্রোম করোনাভাইরাস)। তারপর এলো মের্স-কভ (মিড্ল ইস্ট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোম করোনাভাইরাস)।
আর ২০১৯-এ এলো সার্স কভ-২।
এ-বারেরটি একটু নতুন ধরনের। তাই তার নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া
হয়েছে একটি বিশেষণ, ‘নভেল’ বা নতুন,
আর সেঁটে দেওয়া হয়েছে ২ নম্বর তকমা।
নভেল করোনাভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে, কি ভাবে আক্রমণ
শানায়, তার একটা বিবরণ দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এ&এম ইউনিভারসিটির
জীববিজ্ঞানী প্রফেসর বেঞ্জামিন নিউম্যান।
তাঁর লেখাটি বেরিয়েছে ‘দ্য কনজারভেশন’
জার্নালে।
নিউম্যান বলেছেন যে, করোনাভাইরাস দু ভাবে ইনফেকশন ঘটায় – ফুসফুসে,
যাকে সাধারণ ঠাণ্ডা-লাগা বলা হয়; আর পেটে, যার ফলে ডায়রিয়া দেখা দেয়।
নতুন করোনাভাইরাস থেকে কোভিড-১৯ বলে যে অসুখটা ছড়ায়, সেটি সাধারণ
ঠাণ্ডা-লাগার মতোই শুরু হয়। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই, সেটি মানুষের শরীরের প্রতিরোধ
ব্যবস্থাকে একেবারে ছারকার করে দিয়ে ফুসফুসের ওপর আক্রমণ শানায়। ফলে, ফুসফুসের প্রভূত
ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এবং রোগী মারাও যেতে পারেন সেই কারণে।
প্রফেসর নিউম্যানের কথা অনুযায়ী, শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে যে সার্স-কভ
আর মের্স-কভ ভাইরাস, তাদের সঙ্গে জিনের খুব মিল আছে এখনকার সার্স-কভ-২-এর। কিন্তু কিছু
অমিলও আছে। আর সেই অমিলই নতুন করোনাকে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াতে সাহায্য করে।
নিউম্যান জানিয়েছেন, সেই সঙ্গে পাওয়া গেছে একটি সম্পূর্ণ আলাদা
জিন। সেটির কি কাজ, তা এখনও জানা যায়নি।
প্রফেসর নিউম্যানের মতে, আগের করোনাভাইরাস সার্স-কভ বা মের্স-কভের
মারণ অস্ত্রগুলির সঙ্গে নভেল করোনাভাইরাসের অস্ত্রশস্ত্রের মৌলিক কোনও তফাৎ নেই। কিন্তু
মিউটেশনের মাধ্যমে সেগুলি আরও উন্নত আর আধুনিক হয়েছে বলা চলে। অনেকটা মিগ-২১ আর মিগ-২৯
যুদ্ধ বিমানের মত।
তাই, মানুষকে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের এই নতুন সংস্করণটি
অনেক বেশি ক্ষিপ্র। তার আক্রমণের একটা সুপরিকল্পিত ছক লক্ষ করা গেছে। মানুষের শরীরে
তো নানা ধরনের কোটি কোটি কোষ আছে। কিন্তু ওই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে খুঁজে নেয় সেই
কোষ, যার বাইরের দিকে থাকে এক বিশেষ প্রোটিন – এসিই২ বা অ্যাঞ্জিওটেনসিন-কনভার্টিং
এনজাইম ২। সেই প্রোটিনের সঙ্গে নিজেকে জুড়ে দেয় সে। তারপর নিঃশব্দে কোষের বর্ম কেটে
ঢুকে পড়ে কোষের ভেতর।
কোষের মধ্যে ঢুকে, নভেল করোনা একেবারে পোড় খাওয়া গেরিলার মত
কাজ করে। প্রথমেই সে কব্জা-করা কোষটির সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থাটিকে অকেজো করে দেয়। অর্থাৎ,
সে যে আক্রান্ত হয়েছে, সে যে এক শত্রুর খপ্পরে পড়েছে, কোষটি সেই সঙ্কেত পাঠাতেই পারে
না শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছে। অন্যদিকে, কোষটিকে দখল করার সঙ্গে
সঙ্গে, নভেল করোনাভাইরাস তার মধ্যে বংশ বৃদ্ধি করতে শুরু করে দেয়।
নিউম্যান বলেছেন, ভাইরাসটি গলার ও ফুসফুসের কোষগুলিকে আক্রমণ
করে। আর অঘটন যে একটা ঘটেছে, ইমিউন সিস্টেম তা আঁচ করতে পারে কিছুটা দেরিতে। যখন সংক্রমণের
উপসর্গগুলি একটু একটু করে দেখা দিতে শুরু করে।
কিন্তু মুস্কিল হল এই যে, মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা
এই ভাইরাসটিকে চেনে না। সে কে, কোথা থেকে এসেছে, তার গঠন কি রকম, তার অস্ত্রভাণ্ডারে
কি সরঞ্জাম আছে, কিছুই জানা নেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার। অর্থাৎ, আমাদের শরীর এক পাহাড়প্রমাণ
গোয়েন্দা ব্যর্থতার শিকার হয়।
কিন্তু শরীরের প্রতিরক্ষা বাহিনী তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে
পারে না। একটা প্রতি আক্রমণ তো করতেই হয়। কিন্ত ফুসফুসের কোন অলিতে-গলিতে, কোন রক্তনালীতে,
অসংখ্য কোষের ভিড়ে কোথায় লুকিয়ে আছে গেরিলা ভাইরাস, তা তো জানা নেই। জানার উপায়ও নেই
কোনও।
তাই নির্দিষ্ট টার্গেট লক্ষ করে কামান দাগার বদলে, ফুসফুসের
উপত্যকা জুড়ে শুরু হয় কার্পেট বম্বিং বা নির্বিচারে বোমাবর্ষণ। লক্ষ লক্ষ ইমিউন কোষ
ধেয়ে গিয়ে উড়িয়ে দিতে থাকে ফুসফুসের ভাল এবং সংক্রমিত উভয় কোষকেই।
তার ফলে ফুসফুসের অনেক টিসু দুর্বল হয়ে পড়ে। তার অক্সিজেন পেতে
অসুবিধে হয়। শুরু হয় শ্বাস কষ্ট। কিন্তু অচেনা, অজানা গেরিলা ভাইরাসটিকে হারাতে আমাদের
দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কয়েক দিন ধরে বিপুল সামরিক অভিযান চালায়। সেই কয়েকটা দিন টিকে
থাকতে পারলে, শরীর আবার ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। এবং একসময় সে নিজের ছন্দে ফিরেও আসে।
ছবি: নভেল করোনাভাইরাসের ইলেকট্রন মাইক্রোগ্রাফ (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেক্সাস ডিজিসেস/এনআইএইচ/ফ্লিক্র

Searching analysis of Corona virous enlighten the nation. G.P. M.
ReplyDelete