জেনেছি, কিন্তু শুনিনি







“এই গ্রহে মানুষের আধিপত্যের সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে ভাইরাস।” এ কথা বলেছিলেন ১৯৫৮ সালের নোবেলজয়ী মাইক্রোবায়োলজিস্ট জশোয়া লেডেরবার্গ।  ভাইরাস থেকে যে একটা অতিমারি ঘটবে, সেরকম আশঙ্কা করা হচ্ছিল অনেক দিন ধরে। এক বার নয়, দু’বার নয়, সতর্ক করা হয়েছিল বার বার। সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে সাবধান করছিলেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছিলেন: পৃথিবী জুড়ে একটা অতিমারি কেবল সময়ের অপেক্ষায়।


জশোয়া লেডেরবার্গ

  ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর একটি সাম্প্রতিক লেখার শিরোনামে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, বিশেষজ্ঞরা একটা অতিমারি সম্পর্কে সাবধান করে ছিলেন কয়েক দশক আগে। তা সত্ত্বেও আমরা প্রস্তুত হইনি কেন? লেখাটি লিখেছেন সাংবাদিক রবিন মারান্তস হেনিগ।
  চিকিৎসা বিজ্ঞানে, বিশেষ করে ভাইরাস সংক্রান্ত গবেষণায়, কি জানা যাচ্ছে, তাই ছিল তাঁর আগ্রহের বিষয়। বিজ্ঞানীরা জীবাণু সম্পর্কে কি জানতে পারছেন, ভাইরাসদের গতিবিধি কেমন দাঁড়াচ্ছে, ভাইরাসদের কাছ থেকে মানুষ কতটা হুমকির মুখে পড়তে চলেছে, এই নিয়ে বই লেখার জন্য নিজেও গবেষণা শুরু করেন ১৯৯০-তে। তাঁর বইটির নাম ডানসিং ম্যাট্রিক্স।
  হেনিগ বলছেন, সেই সময়ই বিশেষজ্ঞরা নতুন নতুন ভাইরাসের আবির্ভাবের সম্ভাবনা সম্পর্কে সাবধান করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, আবহাওয়া পরিবর্তন, লাগামছাড়া নগরায়ন, জঙ্গল ধ্বংস আর খামারের পশু বা বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কমে আসা, বিপজ্জনক ও অপরিচিত সব জীবাণুকে সামনে নিয়ে আসার কারণ হয়ে উঠবে। এবং সেই সঙ্গে দেশে দেশে যুদ্ধ, বিশ্বায়ন আর বিমান যাত্রা তাদের পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেবে। অথচ, আসন্ন ভাইরাস আক্রমণ সম্পর্কে বারবার এই রকম সাবধানবাণী শুনেও আমরা নির্বিকার থেকেছি।
  হেনিগ জানিয়েছেন, সেই সময় ভাইরোলজিস্টরা মনে করতেন যে, ভবিষ্যতের অতিমারি হবে ইন্ফ্লুয়েনজা। কিন্তু ইনফ্লুয়েনজাকে কেউই গুরুত্ব দিতে চায়নি সেই সময়, পরেও না। ভাবটা ছিল হাঁচি, কাশি, সর্দি, জ্বর আর কতই বা মারাত্মক হতে পারে! তার তো ওষুধ আছে। ভ্যাক্সিনও তো পাওয়া যায়। কিন্তু হঠাৎ-করে ছড়িয়ে-পড়া অচেনা ভাইরাস যে ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী ইনফ্লুয়েনজা সৃষ্টি করতে পারে, সেকথা বিশ্বাস করতে পারেন নি বিশ্বের মাথারা।
  অথচ, হেনিগের ‘ডানসিং ম্যাট্রিক্স’ প্রকাশিত হওয়ার পরে, এ বিষয়ে আরও কয়েকটি বই বেরয়। যেমন, দ্য হট জোন, দ্য কামিং প্লেগ দ্য স্পিলওভার। প্রতিটিতেই এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কথা লেখা হয়। বিপুল বিক্রিও হয় বইগুলি। কিন্তু সচেতনতা তাতে বাড়েনি।
  ১৯৮০র দশকে আরও একজন প্রথমসারির ভাইরোলজিস্ট এডউইন কিলবোর্ন বলেছিলেন যে, একদিন এমন এক ভাইরাস আসতে পারে যেটি সব পরিবেশে টিকে থাকবে, প্রচণ্ড ছোঁয়াচে আর প্রাণঘাতী হবে, দ্রুত বদলাবে নিজেকে, অনেক প্রাণীর মধ্যে ছড়াবে, ফুসফুস আক্রমণ করবে, নিজের জিন ঢুকিয়ে দেবে মানুষের কোষে এবং সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রায় অসম্ভব হবে। আসলে এই রকম একটি কাল্পনিক ভাইরাসের কথা কিলবোর্ন বলেছিলেন এটাই বোঝাতে যে, ক্রমাগত মিউটেশনের মধ্যে দিয়ে ভাইরাস ওই রকম ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে। একটা ছোট্ট পরিবর্তনও তাদের শক্তি বাড়িয়ে দিতে পারে বহু গুণ।
  হেনিগের মতে আজকের নভেল করোনাভাইরাস কিলবোর্নের কল্পনায় দেখা সেই ভয়ঙ্কর ভাইরাস নয় ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে উনি যেন সেই কাল্পনিক ভাইরাসটির সঙ্গে কিছু মিলও খুঁজে পাচ্ছেন। যেমন, সেটা বাতাসে ভর করে ছড়ায়, চেয়ার-টেবিল, দরজার হাতলে অনেকক্ষণ বেঁচে থাকে এবং শ্বাসনালিতে বংশবৃদ্ধি করে।
  কিন্তু তার চেয়েও বেশি চিন্তার কারণ হল, সংক্রমণ হলেও অনেকের ক্ষেত্রে কোনও উপসর্গ দেখা দেয় না। অর্থাৎ, কারও মধ্যে নভেল করোনাভাইরাস বাসা বাঁধলেও তার নাও হতে পারে অসুখ। এবং সুস্থ সবল থেকে সে আরও দশজনকে সংক্রমিত করতে পারে। ফলে এই ঘাপটি মেরে থাকা নভেল করোনাভাইরাসকে বাগে আনা অন্য করোনাভাইরাসদের তুলনায় হয়তো বেশ কঠিন হয়ে উঠবে।

ছবি: করোনাভাইরাস

পৃথিবীর ডায়েরি

    
  




Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস