ভাইরাস রপ্তানি



  ১২ অক্টোবর ১৪৯২। তারিখটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবিষ্কারের দিক থেকে আর সংক্রমণের দিক থেকেও।

  কলম্বাস সেদিন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছিলেন। কলম্বাস বেরিয়ে ছিলেন ভারত এবং এশিয়ার খোঁজে। ইউরোপবাসীর কাছে ভারত তখন এক রূপকথার দেশ। তার ধনরত্ন, বিপুল ঐশ্বর্যের কথা রাজা রাজড়া আর বিত্তবানদের মুখেমুখে ফিরত। যে ইউরোপীয় দেশ ভারতে প্রথম পৌঁছতে পারবে, সে দেশ অন্যদের পেছনে ফেলে সমৃদ্ধির পথে তরতর করে এগিয়ে যাবে, এমনটাই ছিল বিশ্বাস। কি নেই ভারতে! সোনাদানা, মনি-মুক্ত, মশলার অকল্পনীয় সম্ভার, রেশম, আরও কত কি। কিন্তু জাহাজ যখন ছাড়ল, তখন সেটা ভারতের দিকে মুখ না করে, বন্দর থেকে চলল উল্টো দিকে।

  পৃথিবীটা যে গোল, এই মত ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। তাই কলম্বাস ঠিক করেছিলেন, তিনি অতলান্তিক মহাসাগর দিয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা করবেন। তাহলে, পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তে নিশ্চয় পৌঁছে যাবেন একদিন না একদিন। এবং সেদিনের মানচিত্র দেখে তাঁর ধারণা হয়েছিল, পুবের দূরত্বটা খুব বেশি নয়। মাত্র ২,৪০০ নটিক্যাল মাইল বা ৩,৮৬০ কিমি। সেই রকম হিসেব করেই, ২ অগস্ট ১৪৯২ সালে, কলম্বাসের ‘সান্টা মারিয়া’ জাহাজ স্পেনের পালোস দে লা ফ্রন্টেরা বন্দর থেকে সমুদ্রে পাড়ি দেয়। আর ১২ অক্টোবর, যখন নানা ঝড়ঝাপটার পরে ওই যুগান্তকারী অভিযাত্রায় স্থলভূমি দেখা গেল, তখন সেটা ভারতেরই তটরেখা বলে ধরে নিয়েছিলেন কলম্বাস। কিন্তু আসলে, ভারতের মাটিতে না পৌঁছে কলম্বাসের জাহাজ সেদিন ভিড়েছিল ক্যারিবিয়ান্স-এ। যাচ্ছিলেন ইন্ডিয়া, কিন্তু হাজির হলেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে।

  যেদিন দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে পা রাখলেন স্পেনের নাবিকরা, সেদিন স্পেনের সামনে খুলে গেল এক নতুন দিগন্ত। কিন্তু ওই মহাদেশের আদি বাসিন্দাদের জীবনে দেখা দিল ঘোর বিপর্যয়। ইউরোপীয়রা নিয়ে এলো এক রাশ নতুন ভাইরাস আর জীবাণু। আর তার ফলে দেখা দিতে লাগল ভয়ঙ্কর সব মহামারি। সেগুলির মধ্যে ছিল গুটি বসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ও ডিপথেরিয়া। ওই সব অসুখ সেখানে ছিল না কোনও দিন। কারণ, ওই সব অসুখ সৃষ্টি-করা ভাইরাস ছিল না সেখানে। ইউরোপীয়দের সঙ্গে, জাহাজে চেপে, এলো তারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের শরীর পরিচিত ছিল না তাদের সঙ্গে। তাই ওই সব ভাইরাস আর জীবাণু প্রতিহত করতে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল স্থানীয় আদিবাসীদের শরীরে।

  ‘ইয়েল গ্লোবাল অনলাইন’-এর প্রতিষ্ঠাতা নয়ন চন্দ তাঁর বই ‘বাইন্ড টু-গেদার: হাও ট্রেজার্স, প্রিচার্স, এডভেঞ্চারার্স এন্ড ওয়ারিয়র্স শেপড গ্লোবালাইজেশন’-এ বলেছেন যে, দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বাসের আবির্ভাবের মাত্র ৭০ বছরের মধ্যে ৮-১০ কোটি আদিবাসী ইউরোপীয়দের নিয়ে-আসা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর ওই বইয়ের অংশবিশেষ সম্প্রতি প্রকাশিত হয় ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’য়।

  এতো গেল ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় সংক্রমণ ছড়ানোর একটা দৃষ্টান্ত। তবে তারও আগে ইউরোপ আর এশিয়ায় ছড়িয়ে ছিল একটি ভয়াবহ মহামারি – প্লেগ। আর সেই মারাত্মক অসুখটি এসেছিল চিন থেকে। সেরকমই জানিয়েছেন নয়ন চন্দ তাঁর বইতে। প্লেগ এখন পৃথিবীতে নেই বললেই চলে। কিন্তু প্রায় ১৩৫০ থেকে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত, কয়েক শ’বছর ধরে মানুষকে তাড়া করে বেড়িয়েছে ওই অসুখ।

  প্লেগ ছিল এমনই ভয়ের কারণ যে তাকে বলা হত ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা কালো মৃত্যু। প্লেগের উৎস চিনে। ১৩৩১ সালে সে দেশে দেখা দেয় ওই অসুখ। সেখান থেকে জাহাজে করে প্লেগের জীবাণু আসে কৃষ্ণ সাগরের বন্দর কাফায়। সেখান থেকে ১৩৪৫-এর মধ্যে ইতালির বানিজ্য জাহাজে করে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। একজন ইতিহাসবিদের মতে, সেকালে ইউরোপের জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটির মতো। তার মধ্যে ৫ কোটি নিঃশেষ হয়ে যায় প্লেগের সংক্রমণে। তারপর এশিয়ার নানা প্রান্ত গ্রাস করে ওই অসুখ। ভারতেও এই অসুখ থেকে থেকেই মহামারির আকার ধারণ করে। শরৎচন্দ্রের অনেক লেখায় প্লেগে আক্রান্ত মানুষের মর্মান্তিক বর্ণনা পাওয়া যায়।

  আশ্চর্য ব্যাপার হল, প্লেগের জীবাণু ছাড়াও ফ্লু সৃষ্টিকারী অনেক ভাইরাসেরই উৎস কিন্তু চিন। নয়ন চন্দের লেখা থেকে জানা যাচ্ছে যে, প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট কেনেডি শর্টরিজের মতে, সব ফ্লু অতিমারির উৎস হল চিন। সেই কুখ্যাত স্প্যানিশ ফ্লু, যাতে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রাণ হারান, সেটি নাকি বার্ড ফ্লু হিসেবে ১৮১৮ সালে শুরু হয়েছিল চিনের ক্যান্টন প্রভিন্স-এ। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময়, চিনে শ্রমিকরা ফ্রান্স-এ ট্রেঞ্চ কাটার কাজ করতে গেলে, ওই ফ্লু ভাইরাস ১৯১৮ সালে ইউরোপে, বিশেষ করে স্পেনে, ছড়িয়ে পড়ে। আর সেখান থেকে বিশ্বের অন্যত্র।

  এর পর ১৯৫৭ সালে দেখা দেয় ‘এশিয়ান ফ্লু’ বা এশীয় জ্বর। উইকিপিডিয়া ছাড়াও একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, এশিয়াজুড়ে ওই অতিমারির ভাইরাস, এইচ২এইচ২, এসেছিল চিনের গুইজন থেকে। এশিয়ান ফ্লু দু’বছর ধরে চলে। ওই জ্বরে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ মারা যান।

ঠিক ২০ বছর যেতে না যেতেই আবার ফ্লুয়ের হানা। এবার দেখা দিল ‘হংকং ফ্লু’। ভাইরাসটি এইচ২এইচ২-এর একটু আলাদা সংস্করণ। হংকং’র এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলেও, সেটি চিনের মূল ভূখন্ড থেকেই এসেছিল বলে মনে করা হয়। এই ফ্লু চলে দু’বছর ধরে, ১৯৬৮-৬৯। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এবারও, মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০ লক্ষ।

এর পর, ন’বছরের মাথায়, ১৯৭৭ সালে, এলো ‘রাশিয়ান ফ্লু’। ‘অ্যামেরিকান সোসাইটি অফ মাইক্রোবায়োলজি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র থেকে জানা যাচ্ছে, ভাইরাসটি দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। 

  ভাইরাসটিকে প্রথম শনাক্ত করা হয় চিনের তিনটি জায়গায় – তিয়েনৎসিন, লিইয়াওনিঙ্গ ও জিলিন-এ। ভাইরাসটি ছিল অবিকল ১৯৫০ সালের এইচ১এইচ১ ভাইরাসের মত। বিজ্ঞানীরা বলেন, ২৭ বছর পরে কোনও ভাইরাস একই রূপে ফিরে আসে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, যে কোনও ভাইরাসই নিজেকে অল্প বিস্তর বদলে ফেলে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে, তেমনটা হয়নি। এই রহস্যের কোনও সমাধান পাওয়া যায় নি।

 বিজ্ঞানী মহলের ধারণা, কোনও এক ল্যাবরেটরিতে ভাইরাসটি গবেষণার জন্য সংরক্ষিত ছিল। সম্ভবত, অসতর্কতার কারণে, সেটি ল্যাবের সুরক্ষিত কক্ষ থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। চিনে প্রথম দেখা গেলেও, ভাইরাসটি রাশিয়ায় ব্যাপক সংক্রমণ ঘটায়। পুরনো ওই ভাইরাসটির মারণ ক্ষমতা কমই ছিল। কিন্তু সেটির বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, ২৫ বছরের কম বয়সীরাই তার দ্বারা বেশি আক্রান্ত হতেন।

  তারপর ২০০৩ সালে, চীন থেকে আসে সার্স। ছ মাসের মধ্যে সার্স ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল আর অস্ট্রেলিয়ায়। নয়ন চন্দ লিখছেন, চিনের গুয়াংডং রাজ্যে কিছু লোক এক ধরনের বন বেড়ালের মাংস খেলে, সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হন।
আর এবার, সারা পৃথিবীজুড়ে অতিমারি সৃষ্টি করেছে নভেল করোনাভাইরাস। তারও উৎস সেই চিন।









Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস