মাছেরাও গান গায়



কে জানত মাছেরা গান গায়! ব্রাজিলের এক নৃতত্ত্ব¡বীদ, রাফায়েল জোসে ডি মেনজেস বাসটস। তিনি সে দেশের কামায়ুরা উপজাতিদের ওপর অনেক দিন ধরে গবেষণা করছিলেন। একদিন তাঁর এক কামায়ুরা বন্ধু, একওয়া, ও তিনি ক্যানুতে করে একটি হ্রদে বেড়াচ্ছিলেন। নিস্তরঙ্গ জল কেটে ক্যানু এগোচ্ছিল প্রায় নিঃশব্দে। এমন সময় একওয়া বাসটসকে একটা প্রশ্ন করে বসেন।

  “মাছেদের গান শুনতে পাচ্ছেন কি?” জানতে চান তাঁর একওয়া।

প্রশ্নটা শুনে, অবাক হন বাসটস। ভাবেন, মানুষটি নিশ্চয় খুব ভাবুক প্রকৃতির। চারপাশের শোভা দেখে হয়তো একটু আপ্লুত হয়ে পড়েছেন। হয়ত এক কল্পনার জগতে প্রবেশ করেছেন তিনি। তাই ওই অদ্ভুত ও অবাস্তব প্রশ্ন।

  কিন্তু বেশ কয়েক বছর পর, বেসটস সত্যিই একদিন মাছের গান শুনতে পান। খুবই ক্ষমতা সম্পন্ন মেশিনের সাহয্যে রেকর্ড করা মাছের গান শোনার সুযোগ হয় ওই নৃতত্ত্ববীদের। তখন তাঁর মনে পড়ে যায় ব্রজিলের সেই অরণ্যবাসী একওয়ার কথা। উনি তো মাছের গান শোনার কথাই বলেছিলেন। এখন মেশিনে-ধরা মাছের গানই তো শুনলেন বেসটস। একওয়া তো তাহলে কল্পনার জগতে ভেসে গিয়ে ওই কথা বলেননি। উনি তো নিশ্চয় ক্যানুয় বসে মাছের গান শুনতে পাচ্ছিলেন সে দিন!

  এই ঘটনার কথা লিখেছেন ক্যারেন ব্যাক্কার তাঁর সদ্য প্রকাশিত বই, ‘দ্য সাউন্ডস অফ লাইফ: হাও ডিজিটাল টেকনলজি ইজ ব্রিংগিং আস ক্লোজার টু অ্যানিমালস্ অ্যান্ড প্লান্টস্’ (প্রাণের শব্দ: কী ভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের জীবজন্তু ও গাছেদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে)। “সেই দিন, বেসটস-এর কান বন্ধ ছিল, আর একওয়া’র কান ছিল খোলা,” বলেছেন ব্যাক্কার তাঁর ওই বইতে, যেটি প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভারসিটি প্রেস। বইটিতে মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীরা যে সব আওয়াজ করে, সেগুলির মর্ম বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া’য়। ব্যাক্কারের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করা হয়েছে ওই লেখায়।

  প্রাণী জগতের শব্দ নিয়ে গবেষণা করেন মিশেল আন্দ্রে। ব্যাক্কার তাঁর কথা লিখেছেন বইতে। আন্দ্রে বলেন, “আমরা যখন অ্যামাজনে কাজ করি, তখন অনেক রহস্যময় শব্দ শুনতে পাই আমাদের মাইক্রোফোনের মাধ্যমে। আমরা সেগুলি রেকর্ড করতে পারি, কিন্তু বুঝতে পারি না। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠিগুলি ওই শব্দগুলির মানে বুঝিয়ে দেন আমাদের। ওই শব্দগুলিকে শনাক্ত করা ও তাদের পরিবেশগত তাৎপর্য বোঝার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তাঁদের আছে।”

  মোঙ্গাবেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যাক্কার বলেছেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে ইতিমধ্যেই প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তা থেকে জানা গেছে যে, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীরাও শব্দের মাধ্যমে ভাব বিনিময় করে। খবরাখবরও আদান প্রদান করে তারা। তারা যে এমনটা করে, আমরা তা আগে অনুমান করতে পারিনি। যা তথ্য এখনও পর্যন্ত মিলেছে, তা আমাদের প্রতিষ্ঠিত ধ্যান ধারনার পরিপন্থী। তেমনটাই বলেছেন লেখক।

  হাতি, তিমি, শুশুকরা যে শব্দের মাধ্যমে ভাব বিনিময় করে ও সঙ্কেত পাঠায়, তা আগেই জানা হয়ে গিয়ে ছিল। কিন্তু ব্যাক্কার বলছেন, গবেষণা করতে করতে তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আরও বহু প্রাণী আছে যারা নানান শব্দকে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের কথা আমরা এখন জানতে পারছি।

  ব্যাক্কারের মতে, প্রাণীদের কাছে শব্দের গুরত্ব অসীম। কারণ, পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা কালে, প্রাণীদের চোখ ছিল না। দৃষ্টিশক্তির আগে তারা পেয়েছিল শ্রবণশক্তি। শব্দের সাহায্যেই তারা তাদের চারপাশটা কেমন, তা বুঝে নিত। তাই শব্দের প্রতি তারা আজও অত্যন্ত সংবেদনশীল। আর ঠিক সেই জন্যই, শব্দ দূষণ তাদের কাছে মারাত্মক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।  এমকি তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে।

  সেই তুলনায়, মানুষের শ্রবণশক্তি খুবই দুর্বল। আমরা সব শব্দ শুনতে পাই না। যেমন ইনফ্রাসনিক (খুব কম ফ্রিকোয়েন্সির আওয়াজ) ও আল্ট্রাসনিক (খুব বেশি ফ্রিকোয়েন্সির) শব্দ আমাদের কানে ধরা পড়ে না। আমরা কেবল সেই সব শব্দই শুনতে পাই যেগুলি মাঝারি ফ্রিকোয়েন্সির মধ্যে পড়ে। ফলে, সারা পৃথিবীতে কত রকম আওয়াজ হয়ে চলেছে আর পোকামাকড় থেকে হতি, তিমিরা নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করছে, তা আমাদের কানে আসে না।

  কিন্তু এই পৃথিবীতেই এমন সব বনবাসী, প্রকৃতির খুব কাছের মানুষ, আছেন যাঁরা কান পাতলেই মাছেদের গান শুনতে পান। আজও।

ছবি: মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়া




Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস