চাঁদের মাটিতে জন্মাল গাছ
চাঁদে
গাছ না জন্মালেও, চাঁদের মাটিতে গাছ জন্মেছে। না এটা
কোনও ধাঁধার লাইন নয়। সত্যিই, চাঁদ
থেকে নিয়ে আসা মাটিতে লাগানো হয়ে ছিল বীজ। আর তাই থেকে ফুটে বেরিয়েছে গাছের চারা।
মানুষের ইতিহাসে কেন, পৃথিবীর চারশো কোটি বছরের ইতিহাসে
এমনটা আগে কখনও ঘটেনি। চাঁদ থেকে নিয়ে আসা মাটিতে গজালো গাছ! তাই হয়তো কোনও একদিন, পূর্ণিমার চাঁদের বুকে চাষ করে, গম ফলিয়ে, তৈরি করা যাবে ঝলসানো রুটি।
মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের ফ্লরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই অকল্পনীয় সাফল্য অর্জনকরেছেন। ‘কমিউনিকেশন বায়োলজি’ জার্নালে বেরিয়েছে তাঁদের গবেষণার
ইতিবৃতান্ত। চাঁদের মাটি পৃথিবীর মাটি থেকে গুণগত ভাবে আলাদা। তবুও সেই মাটিতে যে
গাছ গজাতে পারে, বিজ্ঞানীরা তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
এই সাফল্যের পেছনে বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব যেমন আছে, তেমনই আবার,
গাছও প্রমাণ করেছে তার অসীম
প্রাণশক্তি। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর মাটিতে নিজেদের বিস্তার ঘটিয়ে, বাতাস থেকে কার্বন-ডাইঅক্সাইড শুষে
নিয়ে আর অক্সিজেন ছড়িয়ে, তারা এই গ্রহকে সব প্রাণীর বাসযোগ্য
করে তুলেছে একটু একটু করে। এবার তারা দেখিয়ে দিল, চাঁদের মাটিকেও তারা আপন করে নিতে পারে। জানিয়ে দিল, সুযোগ পেলে, চাঁদকেও তারা বাসযোগ্য করে তুলবে হয়তো
একদিন। বলা হচ্ছে, চাঁদে অক্সিজেন সৃষ্টি ও একদিন খাদ্য
উৎপাদন করার লক্ষ্যে এটাই হল প্রথম পদক্ষেপ।
অ্যাপোলো-১১, ১২ ও ১৭ অভিযানে নিয়ে আসা হয়ে ছিল
চাঁদের মাটির নমুনা। খুবই দুর্মূল্য সেই সংগ্রহ। এক সময় গাছেদের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে
দেখা হয়, চাঁদের মাটির স্পর্শে তাদের কী প্রতিক্রিয়া হয়। কিন্তু তেমন কিছু লক্ষ করা যায়নি। অর্থাৎ, সেই মাটিতে ছিল না কোনও জীবাণু বা এমন
কোনও পদার্থ যা পৃথিবীর প্রাণীদের ক্ষতি করতে পারে। এবার দেখা হল, সেই মাটিতে গাছ জন্মায় কিনা।
চাঁদের
মাটি চাইলেই পাওয়া যায় না। গবেষকরা জানিয়েছেন, অনেক চেষ্টাচরিত্র করে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা’র কাছ থেকে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য, তাঁরা পেয়ে ছিলেন মাত্র ১২ গ্রাম মাটি।
ফ্লরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী রব ফেরি বলেছেন, ভবিষ্যতে, অনেক দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে বেরবে
মানুষ। এবং তখন হয়তো চাঁদকেই ব্যবহার করতে হবে প্রথম স্টপ হিসেবে। আরও দূরের কোনও গ্রহের
দিকে পাড়ি দেওয়ার আগে, পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য হয়তো
চাঁদে কাটাতে হবে বেশ ক’টা দিন। তার জন্য চাঁদের পরিবেশে
বাড়াতে হবে অক্সিজেনের মাত্রা। মহাকাশ যাত্রীদের যোগাতে হবে খাবার। আর তাই চাঁদে
গাছ জন্মানো একান্তই জরুরি।
এখনও
পর্যন্ত, পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বে আর কোথাও
প্রাণের হদিস পাওয়া যায়নি। তাই ধরে নিতে হয়, গাছগাছলি একান্তই পৃথিবীরই প্রাণী। এই গ্রহের মাটিতে, বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে, তাদের বিকাশ ঘটেছে। তাদের প্রতিটি
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, কোষ-অনুকোষ, তাদের জন্ম আর বাড়বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী
জিনগুলি, এই মাটিকেই চেনে-জানে। ফলে, চাঁদের সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির
মাটিতে
তাদের জিনগুলি কেমন আচরণ করে, তা
জানতে বিজ্ঞানীরা ছিলেন বিশেষ আগ্রহী। এমন মাটির সংস্পর্শে তো তারা আসেনি কখনও!
বারো
গ্রাম চাঁদের মাটি দিয়ে শুরু হল কাজ। এক একটি বীজের জন্য বরাদ্দ হল এক গ্রাম করে
চন্দ্র মৃত্তিকা। কিন্তু কী গাছ লাগানো হবে চাঁদের মাটিতে। মনোনিত হল, অ্যারাবিডপসিস নামের একটি উদ্ভিদ।
আফ্রিকার বাসিন্দা। কেন অ্যারাবিডপসিস? কারণ, ওই গাছটির জিন-মানচিত্র তৈরি করার কাজ
শেষ হয়ে গিয়েছিল ইতিমধ্যেই। অর্থাৎ, ওই গাছটির আগাপাছতলা জানতেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাগারে, অতি ছোট ছোট প্লাস্টিকের প্লেটে চাঁদের
মাটি বিছিয়ে তৈরি হল ‘চাষের’ খেত। তার সঙ্গে মেশানো হল পুষ্টির এক তরল পদার্থ। আর সেখানে পোঁতা হল
অ্যারাবিডপসিসের বীজ।
পাশাপাশি, এখানকার মাটি দিয়ে তৈরি হল অনুরূপ এক
চাষের জমি। সেই মাটি আনা হয় এমন সব জায়গা থেকে, যেখানে প্রকৃতি খুব নির্মম। সেই মাটি চাঁদ বা মঙ্গলের মাটির মতোই
রুক্ষ। সেখানেও লাগানো হয় ওই গাছের বীজ। চাঁদের মাটিতে লাগানো বীজ কি অঙ্কুরিত হবে
কোনও দিন? সেই সংশয় নিয়েই কাজে নেমে ছিলেন
বিজ্ঞানীরা। কিন্তু একদিন,
বিষম বিস্ময়ে তাঁরা দেখলেন, চাঁদের মাটি ভেদ করে মাথা তুলছে
আফ্রিকার সেই গাছের অঙ্কুর (ছবি)।
দিন
যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, একটা তফাৎ লক্ষ করলেন গবেষকরা। চাঁদের
মটিতে গজানো গাছগুলি এখানকার মাটিতে গজানো গাছগুলির তুলনায় ছিল ছোট। সেগুলির
বৃদ্ধির হারও ছিল তুলনায় বেশ ধীর। তাছাড়া সেগুলির আকৃতিতেও তেমন সামঞ্জস্য ছিল না। কোনওটা ছোট, তো কোনওটা বড়। আরও এক গবেষক, অ্যানা লুই পল, বলেছেন, এ সবের কারণ হল, গাছগুলি
চাঁদের মাটির ভিনড়ব চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিল আপ্রাণ। সেই সঙ্গে
শরীরিক চাপও অনুভব করছিল যথেষ্ট পরিমাণে। তাই সুষম হয়নি তাদের গড়ন।
কিন্তু
এই গবেষণা প্রমাণ করল যে,
চাঁদের মাটিতে গাছ গজাতে পারে। এবং
চাঁদের মাটি ও পরিবেশকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তারা।

Comments
Post a Comment