চেরনোবিল - প্রকৃতি হাসছে

 



[প্রকৃতিকে নিজের মতো থাকতে দাও। তাহলেই সে সেরে উঠে নিজের ছন্দে ফিরবে। এমনটা বারবারই দেখা গেছে। বাড়ির পাশের পার্কে। তেজষ্ক্রিয়তায় ঝলসে-যাওয়া চেরনোবিলেও।

লকডাউনের ফলে, মানুষের প্রতিদিনকার অত্যাচারের হাত থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছিল প্রকৃতি। গাছপালার চেহারাই বদলে গিয়েছিল। পশু-পাখিরা অনেক বেশি নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করছিল। যেন ফিরে-পাওয়া স্বাধীনতা উপভোগ করছিল তারা।

পৃথিবীর ডায়েরির কার্যালয়ের কাছেই একটা পার্ক আছে। লকডাউনের দিনগুলিতে সেটির গেটগুলিতে তালা ঝুলত। পার্কে কেউ ঢুকত না। দেখতে দেখতে, পার্কটা ছোট ছোট গাছে ভরে গেল। আমরা যাদের বলি আগাছা, তারা সেখানে মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলল। হাঁটার বাঁধানো পথটা চলে গেল ঘাস আর লতাদের দখলে। বুনো ফুল ফুটতে শুরু করল সেই চলার পথের দু’ধারে। নানা ধরনের পোকাদেরও আবির্ভার ঘটল সেখানে – ফড়িং, শুঁয়োপোকা, মৌমাছি, কেঁচো, কেন্নো, পিঁপড়ে ও আরও বেশ কত নাম-না-জানা পতঙ্গ। ফলে, চড়াই, শালিক, দোয়েল, ছাতারে, কাঠঠোকরাদের ভোজন তালিকা লম্বা হতে লাগল দিন দিন। কাঠবেড়ালিদের ছুটোছুটি দৃশ্যতই বেড়ে গেল। জায়গাটা নিরাপদ মনে করে, যত্রতত্র ডিম পাড়ল গিরগিটিরাও। সব মিলিয়ে, একটা খুদে জঙ্গলে পরিণত হয়ে জীববৈচিত্রে ভরে উঠেছিল পার্কটা।

এখন অবশ্য আর তেমনটা নেই। পুজোর আগে কেটে, ছেঁটে, চেঁছে সাফ করে দেওয়া হয় জায়গাটা। বুনো ফুল সেখানে আর ফোটে না।

কিন্তু পরমাণু বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত চেরনোবিলে মানুষের পায়ের চিহ্ন এখনও তেমন পড়ে না। কেমন আছে প্রকৃতি সেখানে? জেনে নেওয়া যাক।] 

 

তারা একে একে আবার ফিরে আসছে। নাহ, মানুষ নয়।  শেয়াল, নেকড়ে, বাইসন, ভালুক, এমনকি এক বিশেষ প্রজাতির বিপন্ন হয়ে যাওয়া ঘোড়াও। চৌত্রিশ বছর আগে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটে যাওয়া অধুনা পরিত্যক্ত নগরী চেরনোবিলে এখন এইসব বন্যপ্রাণীর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তারা কি আগে কখনও এখানকার বাসিন্দা ছিল? না তো।  সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সে তো ছিল এক কর্মব্যস্ত নগরী। 

আসলে বন্যপ্রাণীরা একে একে সেখানে আসছে যেন শরণার্থী হয়ে।  যেখানে মানুষের আর কোনও চিহ্নমাত্র নেই। এবং তাদের হাত থেকে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই বলেই বোধহয় নির্ভয়ে বসবাসের জন্যই চেরনোবিলের নগর অরণ্যে আশ্রয় নিচ্ছে ওই বন্যরা। 

সেটা ছিল ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল।  সোভিয়েত ইউনিয়নে চেরনোবিলের পরমাণু শক্তিকেন্দ্রে সেদিন এখনও পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম পরমাণু বিপর্যয়টি ঘটেছিল। এবং তা থেকে যে পরমাণু বিকিরণ ছড়িয়ে পড়েছিল, বলা হয় জাপানে হিরোসিমায় ফেলা পরমাণু বোমার থেকে তার মাত্রা ছিল ৪০০ গুণ বেশি। এবং সেদিন ওই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় চেরনোবিল-প্রান্তরে পরমাণু বিকিরণের যে মারণ বিষ সেখানকার জল- মাটি-বাতাসকে মারাত্মক বিষিয়ে তুলেছিল, তাতে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে।  এবং ৩ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় অন্যত্র। যারা এখনও আর সেখানে ফিরে আসেনি। 

তবে তারা না ফিরলেও কিন্তু বন্য প্রাণীরা সেখানে আসছে। ছানা পোনা নিয়ে রীতিমতো ঘর বাঁধছে। কারণ সেই পরিত্যক্ত চেরনোবিল এখন সবুজ অরণ্যে ঢাকা। গাছের ফাঁক দিয়ে একদা প্রাণ চঞ্চল সেই মৃত শহরের ঘর বাড়ি অবশ্য এখনও উঁকি মারছে। কিন্তু সেই বিষাক্ত শহরে কীভাবে যেন আবার প্রাণ জেগে উঠছে। আসলে গত চৌত্রিশ বছর ধরে প্রকৃতি তার অসুখগুলিকে বোধহয় একটু একটু করে নিজেই সারিয়ে তুলেছে। এবং আপনা থেকেই সেখানে তৈরি হয়েছে নগর অরণ্য। ফুলে ফলে সে সাজিয়ে তুলছে নিজেকে। প্রায় ২০০-রও বেশি প্রজাতির পাখির কল-কাকলিতে এখন মুখর সেই অরণ্য। যে অরণ্যে নেকড়ে, শেয়াল, পাখিদের ছানারা জন্মাচ্ছে, বড় হচ্ছে। যেখানে গড়ে উঠেছে এক নতুন জীববৈচিত্র্য।

এই সব দেখে বিজ্ঞানীরাও বিস্মিত। তাঁরা বিষক্রিয়ার হাত থেকে বাঁচতে  নানাবিধ সাজ-সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে সেই নগর অরণ্যে হাজিরও হচ্ছেন।   পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাঁরা জানতে চাইছেন কীভাবে সেখানে আবার প্রাণের স্ফুরণ ঘটছে? সেখানকার জল মাটি গাছপালা ও প্রাণীদেহে পরমাণু বিকিরণের রেশ কতটা থেকে যাচ্ছে? আদৌ কি তা মানুষের স্থায়ী বসবাসের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠছে?

কারণ, সেদিনের দুর্ঘটনায় সংলগ্ন পাইন অরণ্যটি তো পুড়ে ঝলসে যায়। সেই থেকে তার সমস্ত লাল হয়ে যাওয়া পাতার ‘রেড ফরেস্ট’-এ সর্বাধিক রেডিয়েশন মেলে। একদা মরুভূমি হয়ে যাওয়া সেই প্রান্তরই কত দিনে নিজ-দেহের বিকিরণের মাত্রা এমন কমিয়ে ফেলতে পারল? না হলে প্রাণীরাই বা কীভাবে সেখানে এমন স্বাভাবিক জীবন ছন্দে ফিরে আসছে - এই সব প্রশ্নের উত্তর শুধু বিজ্ঞানীরা নন, আমরাও তো জানতে চাই। 

মালবী গুপ্ত

সূত্র: প্রি.অরজ/ চেরনোবিল,ট্রিহাগার.কম

 

Comments