পৃথিবী ছাড়া হবে কি মশারা


তারা থাকবে না কি তাদের একেবারে নির্বংশ করে ফেলা হবে, তাই নিয়ে প্রবল তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে ছিল ২০১৬ সালে। সেই বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। যদিও আকারে খুবই ছোট, দু’আঙুলেই তাকে টিপে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর সব চেয়ে বিপজনক প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত সেই মশার ভয়ই সারা বিশ্ব এখন থহরিকম্প। কারণ এমনিতেই বছরে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় তার বাহিত রোগের সংক্রমণে। তার ওপর ‘জিকা’ নামে এমন এক ভাইরাস সে বহন করছে যা দক্ষিণ আমেরিকায় জন্মানো হাজার হাজার শিশুর মস্তিষ্কের ত্রুটির জন্য তাকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। ফলে সে আদৌ আর পৃথিবীতে ঠাঁই পাবে কি না, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন দানা বেঁধেছে।

বিবিসি’র একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, জীববিজ্ঞানী অলিভিয়া জাডসন’র মতো কেউ কেউ মনে করছেন, ওই জীবাণু বাহিত মশাদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া উচিত। তাহলে বছরে অন্তত ১০ লক্ষ প্রাণ আমরা বাঁচাতে পারব। কিন্তু এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে এই কারণে যে, নানা জ্ঞাতি গোষ্ঠী মিলিয়ে এখন পর্যন্ত জানা মশক প্রজাতির সংখ্যা ৩৪০০।  যার মধ্যে বেশির ভাগই মানুষ সম্পর্কে উদাসীন। গাছ-পাতা, ফুল-ফলের মধুর ওপরই নির্ভর তাদের জীবনযাপন। এবং সমগ্র মশককুলের মাত্র ৬ শতাংশ প্রজাতি মানুষের রক্ত সম্পর্কে আগ্রহী। অবশ্য তাদের মধ্যেও আবার সকলে নয়, কেবল নারী বাহিনীই মানুষের পক্ষে বিপদজনক। তারা নিজেদের ডিমকে পুষ্ট করার জন্য আমাদের রক্ত শুষে নেয়। এবং রক্তচোষাদের মধ্যে অর্ধেক বহন করে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, পীত জ্বর ও জিকার মতো জীবাণু।

ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এবং অক্সিটেক ফার্ম পরীক্ষামূলক ভাবে এডিস ইজিপ্টি, যে প্রজাতির মশা জিকা ও ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে, তাদের মধ্যে পুরুষ মশাদের জিন বদলে দিয়েছেন। জানা গেছে ওই জিন পরিবর্তিত পুরুষ মশারা এমন একটি জিন বহন করছে যে তাদের ছানারা ঠিকমত বড় হয়ে উঠতেই পারছে না। এবং তারা প্রজনন ক্ষমতা অর্জনের আগেই মারা যাচ্ছে। ফলে তাদের মাধ্যমে ওই মারণ জীবাণু বাহিত হওয়ার পথটাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

এই জিন পরিবর্তিত প্রায় ৩০ লক্ষ মশাকে কেম্যন দ্বীপে ২০০৯-২০১০ সালে ছাড়াও হয়েছিল। দেখা যায়, আশপাশের অঞ্চলের থেকে সেখানে ৯৬% মশা কমেছে। এবং ব্রাজিলে, যেখানে ওই জিকা জীবাণুর আবির্ভাব ঘটেছে, সেখানে এই পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে মশা কমেছে ৯২%।

তাই ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতঙ্গবিশারদ ফিল লয়নিবস মনে করেন, মশাদের নির্বংশ করলে প্রকৃতিতে যে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঘটবে তা একেবারেই কাম্য নয়। কারণ, তিনি বলেছেন, মশারা মূলত উদ্ভিদের মধু খেয়ে বাঁচে এবং পরাগ মিলন ঘটানয় তাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, মশারা পাখি ও বাদুড়ের খাদ্য। আবার ব্যাঙ ও মাছের খাদ্য মশার লার্ভা। তাই তারা নির্বংশ হলে এই গোটা খাদ্য শৃঙ্খলের ওপরই কুপ্রভাব পড়বে।

জাডসন অবশ্য বলছেন যে, “খাদ্য ও পরাগ মিলনকারী হিসেবে মশার জায়গা অন্য কোনও কীট পতঙ্গ ঠিকই পূরণ করে দেবে।”

কিন্তু লয়নিবস এই বলে সতর্ক করেছেন যে, “মশার জায়গা দখল করা পোকা মাকড় জনস্বাস্থ্যের পক্ষে আরও বড় সমস্যা ডেকে আনতে পারে এবং মশারা যে হারে জীবাণু ছড়াচ্ছে তার থেকে আরও ব্যাপক হারে, আরও দ্রুত বেগে, রোগ ছড়াতে পারে।”

বিজ্ঞান-লেখক ডেভিড কুয়ামেন মনে করেন, প্রকৃতিতে মানুষের ওপর মশার ধ্বংসাত্মক প্রভাব খুবই সীমিত। যদিও মশারাই মূলত ক্রান্তীয় বর্ষা-অরণ্যকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে রেখেছে। যে অরণ্য পৃথিবীর বৃহদংশ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির আবাসস্থল।কিস্তু মানুষের বিপুল ধ্বংসাত্মক কাজকর্মের ফলে সেই অরণ্যই তো এখন ধ্বংসের মুখে।

কেউ কেউ মনে করছেন, যে প্রজাতিটি মানুষের পক্ষে বিপদজনক, তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াটা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে মানুষ নিজেই পৃথিবীর অসংখ্য প্রজাতির অস্তিত্বের পক্ষে হুমকি। তবে সম্পূর্ণ অজান্তে অনিচ্ছাকৃত ওই সব মারণ জীবাণু বহনকারী মশারা থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে বিতর্ক এখন বহু দিন চলবে। চলবে তাদের নিয়ে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষাও। কিস্তু মশককুল তো বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এই ভেবে যে, কোটি কোটি বছর ধরে এবং মানুষেরও অনেক আগে থেকে বসবাস করা তাদের এই প্রিয় নীলগ্রহকে সত্যি সত্যি না চিরতরে ছেড়ে চলে যেতে হয়।

মালবী গুপ্ত

 

Comments