ভাল ভাইরাস, মন্দ ভাইরাস
নভেল করোনাভাইরাস, ইবোলা, সার্স বা এইচআইভির মতো আরও কিছু উগ্রপন্থী ভাইরাসদের কাণ্ডকারখানা দেখে সমগ্র ভাইরাস জাতির কপালে ‘দুষ্কৃতি’ তকমা এঁটে দেওয়া ঠিক নয়। মন্দ ভাইরাস যেমন আছে, তেমন অনেক ভাল ভাইরাসও আছে পৃথিবীতে। ভাইরাস না থাকলে মানুষ বাঁচতই না। এমনকী, এখন তো অসুখ সারাতেও ভাইরাস ব্যবহার করা হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে।
মানুষের সঙ্গে ভাইরাসের সম্পর্কটা বেশ নিবিড় এবং বহুকালের।
বেশ কিছু ভাইরাস আমাদের অসুস্থ করে। আবার এমন অনেক আছে যারা আমাদের সুস্থও করে তুলতে
পারে।
ভাইরাস যে আমাদের অসুখ সারাতে পারে তার প্রমাণ মেলে বছর চারেক
আগে। ‘ডিস্কভার ম্যাগাজিন’-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ঘটনাটি ঘটে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে। সেখানে ৭৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তির হার্টের
শিরায় অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু সেরে ওঠার বদলে, সেই ক্ষত স্থানে দেখা দেয় ইনফেকশন
বা সংক্রমণ। যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা সত্ত্বেও, পরিস্থিতির উন্নতি
হয় না। উপরন্তু ব্যাক্টিরিয়ার সংক্রমণ ক্ষতটিকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে, রোগীর অবস্থার অবনতি
ঘটতে থাকে। স্পষ্টতই, এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করেনি। ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
গড়ে তুলেছিল ব্যাক্টিরিয়া। সেই জীবন-মৃত্যুর চরম মুহূর্তে, এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা।
ঠিক হয়, জীবাণু মারতে প্রয়োগ করা হবে ভাইরাস।
অনেক ভাইরাস আছে যারা ব্যাক্টিরিয়া নিধনে বেশ পটু। চিকিৎসাশাস্ত্রে
তাদের একটা বিশেষ নাম আছে – ‘ফেজ’। ব্যাক্টিরিয়ার কোষের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের অকেজো
করে দেয় ওই ফেজ গোত্রের ভাইরাসগুলি।
সে দিনের সেই মুমূর্ষু রোগীকে সুস্থ করে তোলার জন্য কোথায় পাওয়া
গেল সেই ভাইরাস? রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, সেটিকে আনা হয় কানেক্টিকাট শহরের একটি ‘পন্ড’
বা জলাশয় থেকে। সেটির নাম ডজ পন্ড। তাতে মাছ, শেওলা, জলজ পোকা-মাকড়, ব্যাক্টিরিয়া,
ভাইরাস, সবই মিলে মিশে থাকে। ডজ পন্ড থেকে তুলে আনা সেই ভাইরাস ল্যাবরেটারিতে পরিশ্রুত
করা হয়। তারপর অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে মিশিয়ে কয়েক কোটি ভাইরাস ইঞ্জেক্সনের মাধ্যমে
ঢোকানো হয় রোগীর শরীরে।। আশ্চর্য ব্যাপার
হল, এর ফলে রোগীর শারীরে উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়। আর চার সপ্তাহের মধ্যে জীবাণুমুক্ত
হয়ে যায় তাঁর হৃদযন্ত্রের কাছে ক্ষত স্থান। এই চিকিৎসা পদ্ধতি ‘ফেজ থেরাপি’ নামে খ্যাত
হয়। আর চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে নিজের স্থান করে নেয় ‘ওএমকেও-১’ নামের ওই জীবাণু-নিধনকারী
ভাইরাস।
এই কেসটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভারসিটির
জীববিজ্ঞানী পল টার্নার। ওই ফেজ থেরাপির সাহায্যে উনি আরও ১৩ রোগীকে সারিয়ে তোলেন।
১৯২৮ সালে অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর পেনিসিলিন আবিষ্কার চিকিৎসা
বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। পেনিসিলিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে জীবাণুর
সংক্রমণ অতি সহজেই নির্মূল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু কিছু কালের মধ্যেই পেনিসিলিনের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে নানা ধরনের ব্যাক্টিরিয়া। সেই থেকে একের পর এক নতুন নতুন
অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়েছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবাণুরাও অল্পবিস্তর প্রতিরোধ
গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে সেগুলির বিরুদ্ধে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই, অ্যান্টিবায়োটিক আর
কাজ করে না ব্যাক্টিরিয়ার বিরুদ্ধে। অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ বানচাল করতে ব্যাক্টিরিয়ার
বর্ম চিকিৎসকদের কাছে এখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু অনেক ভাইরাস জীবাণুদের অনায়াসেই নির্মূল করে দেয়। প্রকৃতিতে
এই ভাইরাস-ব্যাক্টিরিয়া সংঘাত অবিরাম ঘটে চলেছে। সে ভাবেই প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে রাখে
ব্যাক্টিরিয়ার সংখ্যা।
‘ওয়ার্ল্ড জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ফার্মাকোলজি অ্যান্ড
থেরাপিউটিকস’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে ১০৩১-১০৩২
(১-এর পর ৩১ বা ৩২ শূন্য বসালে যে সংখ্যা হয়) ফেজ আছে, যারা দিন-রাত ব্যাক্টিরিয়া
কমানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। গবেষণা পত্রটি থেকে আরও জানা গেছে যে, ওই পরিমাণ ফেজ সমুদ্রপৃষ্ঠে
ভাসমান যত ব্যাক্টিরিয়া আছে, তার ২০-৪০ শতাংশ নির্মূল করে প্রতি ২৪ ঘন্টায়।
এই অতি গুরত্বপূর্ণ কাজটা নিঃশব্দে করে চলেছে ভাইরাস। তা না
হলে, এতই ব্যাক্টিরিয়া জমা হত যে, আমাদের বেঁচে থাকাই দুষ্কর হয়ে উঠত। তাই বাঁচার স্বার্থেই
ভাল ভাইরাসদের এখন স্মরণ করছেন বিজ্ঞানীরা।
পিডি

Comments
Post a Comment